Jagadhatri Puja 2023: কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী দেবী “বুড়িমা” নামে কেন পরিচিত?

হাতেগোনা কয়েকটা দিন পরেই জগদ্ধাত্রী পূজাকালী পূজার আনন্দ কাটিয়ে জগদ্ধাত্রী পূজা আরো একটি বড় উৎসব বাঙালির জীবনে। ঐতিহ্যের প্রতীক এই দেবী জগদ্ধাত্রী পূজা নামকরা কিছু জায়গায় খুবই ঘটা করে উদযাপন করা হয়। অনেক পুরনো হলেও ঐতিহ্য তে পড়েনি এতটুকুও বয়সের ছাপ।

সমস্ত জায়গার তুলনায় কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পূজা সকলের মন কাড়ে আজও। সেই একইভাবে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে পূজিতা হন মা জগদ্ধাত্রী। মা জগদ্ধাত্রী এখানে “বুড়িমা” নামে সকলের কাছে পরিচিত। তবে এই বুড়িমা নামে তাকে কেন ডাকা হয় সেটা হয়তো অনেকেই জানেন না।

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী দেবী "বুড়িমা" নামে কেন পরিচিত?
কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী দেবী “বুড়িমা” নামে কেন পরিচিত?

কৃষ্ণনগরের দুটি প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পূজা খুবই জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়। একটি হলো কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজা এবং আরেকটি হল বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা। তবে এখানে বুড়িমা হলেন সকলের উপরে। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পূজার ঐতিহ্য এবং আবেগের একটি নাম হলো চাষাপাড়ার বুড়িমা।

চাষা পাড়ার বারোয়ারি বুড়িমা পূজা:

লোকোমুখে শোনা যায় যে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজোর প্রচলন এর পরে থেকেই চাষা পাড়ায় বারোয়ারি অর্থাৎ বুড়িমার পুজো শুরু হয়।

আর এই পুজোর পিছনে রয়েছে এক আকর্ষণীয় ইতিহাস। মা জগদ্ধাত্রী নাকি স্বয়ং রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কে স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন এই পূজা করার জন্য।

কৃষ্ণনগরের চাষা পাড়ার বুড়িমা পূজার ইতিহাস:

কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কোন এক সময় রাজবাড়ীর পূজার জন্য বিপুল পরিমাণে টাকা খরচ হয়ে যাওয়া নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, আর সেই সময় মা জগদ্ধাত্রী তাকে স্বপ্নে আদেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, চাষা পাড়ার যে সমস্ত লেঠেলরা আছেন তাদের দিয়ে দেবী জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করানোর জন্য।

যেমনি স্বপ্নে আদেশ পাওয়া তেমনি কাজ, সেই থেকেই শুরু হয় কৃষ্ণনগরের চাষা পাড়ায় বারোয়ারী জগদ্ধাত্রী পূজা। তার পাশাপাশি চলে রাজবাড়ীতেও জগদ্ধাত্রী পূজা। কাল ক্রমে আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ বছর আগে এখানকার মাতৃ প্রতিমার নাম হয় বুড়িমা সেই থেকে আজও পর্যন্ত কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর সেরা আকর্ষণ হল এই চাষা পাড়ার বুড়িমা পূজা।

আর একটি কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, কৃষ্ণনগরের রাজা সাধারণ মানুষের মধ্যে জগদ্ধাত্রী পূজা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আর্থিক সহযোগিতা করতেন, সেই থেকেই চাষা পাড়া সার্বজনীনের পূজো চালু হয়েছিল। আর জগদ্ধাত্রী পূজা প্রতিবছর এখানে খুবই ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়।

তবে বর্তমানে সাধারণ মানুষের দান এবং চাঁদার উপর নির্ভর করেই এই চাষা পাড়ার বুড়িমা পূজা অর্থাৎ জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সম্পূর্ণ দানের টাকায় এখানকার জগদ্ধাত্রী মায়ের পূজা করা হয় খুবই ধুমধাম ভাবে, সকলেই মেতে ওঠেন আনন্দে।

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী “বুড়িমা” খুবই জাগ্রত:

দেবী দুর্গা জগদ্ধাত্রী রূপে সকলের কাছে পুজিতা হন। গোটা কৃষ্ণনগর বাসীর কাছেই এই বুড়িমা খুবই জাগ্রত দেবী। আর সেই থেকে বুড়িমার মহিমা ছড়িয়েছে রাজ্য থেকে রাজ্যে এবং দেশ থেকে বিদেশেও।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জগদ্ধাত্রী পূজার দিন দান হিসেবে নগদ টাকা, শাড়ি, গয়না যেমন ধরুন সোনা, রুপোর গয়না, আসে জগদ্ধাত্রী মায়ের জন্য অর্থাৎ এখানকার বুড়িমার জন্য। স্থানীয় মানুষজনদের বিশ্বাস অনুসারে জানা যায় যে, এখানে বুড়িমার কাছে মন থেকে ভক্তি ভরে কিছু চাইলে তা তিনি খুবই তাড়াতাড়ি পূরণ করে দেন।

কৃষ্ণনগরের বুড়িমা কে নিয়ে রয়েছে অনেক অনেক অলৌকিক কাহিনী। যে অলৌকিক কাহিনী গুলোর সাথে অনেকেই পরিচিত এবং তাদের সাথেও এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও কৃষ্ণনগরের সমস্ত প্রতিমা অর্থাৎ জগদ্ধাত্রী পূজার পর জগদ্ধাত্রী প্রতিমা বিসর্জন হওয়ার সবার শেষে এই বুড়িমা বিসর্জন করা হয়। সবার শেষে বিসর্জন হয় মানে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়, তবুও কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত বুড়িমা বিসর্জনে যাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন ভক্তরা অধীর আগ্রহে।

কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজা:

কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পূজা খুবই পুরানো আর এই পূজা যথেষ্ট ঐতিহ্যমন্ডিত। নবমীর সন্ধের সময় সেখানে এতটাই জনসমাগম ঘটে যে, সামান্য পরিমাণ জায়গায়ও ফাঁকা থাকে না।

আর এই দিনটিতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদ এক অন্য রূপে ধরা দেয় সকলের কাছে। রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল সেটা নিয়ে রয়েছে অনেক মতভেদ।

তবে অনেকেই মনে করেন এই পূজোর প্রচলন হয়েছিল ১৭৫৪ সালে। কাহিনী অনুসারে ১২ লক্ষ খাজনা দিতে না পারার জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দী করা হয়েছিল তৎকালীন বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁ এর দ্বারা।

তারপর যেদিন তিনি ছাড়া পেয়ে কৃষ্ণনগর ফেরার পথে রওনা দেন, সেই সময় নদীর ঘাটে তিনি বিসর্জনের বাজনা শুনে বুঝতে পেরেছিলেন যে দুর্গাপূজার বিসর্জন হচ্ছে, তাই সে বছর তিনি দুর্গাপূজা করতে না পারার জন্য অনেকখানি মনমরা হয়ে পড়েন।

এমন পরিস্থিতিতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে আদেশ পান যে, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে তিনি এই দুর্গা দেবীকে জগদ্ধাত্রী রূপে পূজা করতে পারবেন। আর সেখান থেকেই কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীতে জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু হয়েছে, আজও তা ধুমধাম এর সঙ্গে পালন করা হয়।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পূজার ভোগ:

প্রতিটি পূজায় ভোগ, নৈবেদ্য একটি সাধারণ বিষয় হলেও জগদ্ধাত্রী পূজাতে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করে মাকে সন্তুষ্ট করা হয়। তেমনি কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীতে এখনো পর্যন্ত আগের মত নিয়ম মেনে নিষ্ঠার সাথে, ভক্তির সাথে, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিন তিনবার পূজা করা হয়। তার সাথে সাথে পোলাও, খিচুড়ি, তিন রকম অথবা পাঁচ রকমের মাছ, তরকারি, মিষ্টি, পায়েস দিয়ে সাধারণত ভোগ নিবেদন করা হয় মা কে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে যে জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হয় সেটা দেখার জন্য প্রতিবছর সেখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভক্তদের সমাগম চোখে পড়ার মতো। রাজবাড়ী যেন এক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। বহু দূর দূরান্তর থেকে ভক্তরা আসেন এখানে জগদ্ধাত্রী পূজায় সামিল হওয়ার জন্য।

আপনিও কিন্তু খুবই সহজে কৃষ্ণনগরের এই রাজবাড়ীতে জগদ্ধাত্রী পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। সেখানে অংশগ্রহণ করার ফলে পূজার আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক আভাস আপনি অনেকখানি তো পাবেনই, তার পাশাপাশি এই জগদ্ধাত্রী পূজার ইতিহাসের মধ্যে আপনি হারিয়েও যেতে পারেন।

Leave a Comment