অপরাজিতা পূজা 2023: অপরাজিতা পূজা দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের পরেই কেন করা হয়? জানেন কি?

আনন্দ উৎসব আর হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে চলা এই দুর্গাপূজার কটা দিন সকলের খুবই সুন্দর ভাবে কাটে, তবে দিন গড়িয়ে বিজয়া দশমী চলেই আসে। দশমী মানেই সর্বত্রই বিদায় এর সুর। কেননা এই দিন উমা যে কৈলাসী পাড়ি দেবেন।

অপরাজিতা পূজা দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের পরেই কেন করা হয়?
অপরাজিতা পূজা দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের পরেই কেন করা হয়?

কিন্তু এদিন এই দুর্গার আরো এক রূপের পূজা করা হয়। তিনি নিজের বাড়িতে চলে যেতে যেতে ও আবার অন্য রূপে পূজিতা হন। বিসর্জনের পর হয় বোধন, শারদীয়ার পর পূজিতা হন দেবী অপরাজিতা। তবে এই দেবী অপরাজিতা দেবী দুর্গারই অন্য একটি রূপ।

অপরাজিতা পূজার মাহাত্ম্য:

তবে এই অপরাজিতা পূজা নিয়ে অনেকেরই হয়তো ধারণা নেই। কোন কাজে এবং যুদ্ধে বিজয় লাভের সংকল্প নিয়ে অপরাজিতা পূজা করা হয়। তবে কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে নবরাত্রীর পর রাজারা যুদ্ধযাত্রা করতেন।

আর যুদ্ধে জয়ী হয়ে আসার জন্য সকলেই এই বিজয়া দশমীর দিনটি পালন করতেন এবং এই দিনে যাত্রা শুরু করতেন। বলা যেতে পারে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বিজয়া দশমীর দিনটি বেছে নেওয়া হতো। যুদ্ধের জন্য এই সময়টাকেই রাজারা খুবই শুভ বলে মনে করেন। তার অবশ্য অনেক কারণ ছিল।

তাছাড়া “অস্ত্রশাস্ত্র” অনুযায়ী এই সময়টাকে যুদ্ধযাত্রার শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পণ্ডিত রঘুনন্দন এর “তিথিতত্ত্ব” গ্রন্থেও একই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজারা যদি দশমীর পর যাত্রার সূচনা করেন তাহলে তার জয় হয় না।

সেই কারণে বিজয়া দশমীর তিথি থাকতে থাকতে এই যুদ্ধের জন্য যাত্রা শুরু করতে হয়। আর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফেরার জন্য অপরাজিতার পূজা করা হয়। তাই বিজয়লক্ষ্মীকে বরণের প্রত্যাশা নিয়ে করা হয় অপরাজিতা পুজো। আর সেই প্রথা প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময়েও চলে আসছে।

অপরাজিতা পূজা:

এই দিনে কিন্তু সাদা অপরাজিতা গাছকে পূজা করা হয়। সাদা অপরাজিতা গাছ কে দেবী রূপে কল্পনা করে পূজা করা হয় ফুল আর বেলপাতা দিয়ে।

অনেকে আবার ঘট স্থাপন করেও এই অপরাজিতার পূজা সম্পন্ন করেন। এর পাশাপাশি এই পুজোর শুভ ফল লাভ করার জন্য হাতে অপরাজিতা লতা বেঁধে রাখার রীতিও প্রচলিত রয়েছে।

এই দিন দেবী অপরাজিতার কাছে প্রার্থনা করা হয় যে, যেন সেই যুদ্ধে জয়লাভ করা হয়, শত্রু নাশ করে যেন সুন্দরভাবে ফিরে আসা যায় নিজের রাজ্যে।

যেমন রামচন্দ্র রাবণের উপর বিজয় লাভ করেছিলেন তেমনি ভাবেই বিজয় লাভ করার জন্য সাধারণ মানুষ জন এবং রাজারা এইভাবে অপরাজিতা পূজা করতেন ও সেই প্রথা আজও বিদ্যমান।

অপরাজিতা দেবীর রূপ:

অপরাজিতা দেবী দুর্গা দেবীরই একটি রূপ। তিনি চতুর্ভূজা, দেবীর হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয় মুদ্রা। গায়ের রং নীল, ত্রি নয়না এবং মাথায় রয়েছে চন্দ্রকলা।

দুর্গা বিসর্জনের মন্ত্র পাঠের পরেই মন্ডপের ঈশান কোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে অপরাজিতা লতা রেখে এই অপরাজিতা দেবীর পূজা করা হয়।

সারা বছর যেন জীবন যুদ্ধে অপরাজেয় থাকতে পারে সেই কামনা নিয়েই অপরাজিতা পূজাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন সকলেই। আর এই লক্ষ্য নিয়ে বিজয়া দশমীর দিন দেবী দুর্গার বিসর্জন এর মন্ত্র পাঠের ঠিক পরেই হয় অপরাজিতা পূজা অর্চনা।

কনক পুরের অপরাজিতা পূজার ইতিহাস:

এক একটি জায়গায় এক একটি পূজা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এই অপরাজিতা পূজা কনকপুর গ্রামে খুবই ধুমধাম ভাবে পালন করা হয়। তবে এখানে যে অপরাজিতার মূর্তি ছিল সেটি অনেকের ধারণা অনুসারে বর্গী আক্রমণের সময় সেই মূর্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে যেখানে অপরাজিতা মায়ের মন্দির রয়েছে সেখান থেকে পশ্চিমে “খাঁড় পুকুর” নামে একটি পুকুরে মূর্তির একটি অংশ পড়েছিল। পরবর্তীতে পুকুর খনন করার সময় সেই মূর্তির ভাঙ্গা অংশটি পাওয়া যায়। এখনো অপরাজিতা মন্দিরের পাশে শিব মন্দিরে সেই ভগ্ন পাথর অর্থাৎ মূর্তির অংশটি রয়েছে।

কাহিনী অনুসারে জানা যায় ১০০ বছর আগে কাশি থেকে অপরাজিতা মায়ের মুখ নিয়ে এসে নতুন করে স্থাপন করা হয়েছিল। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় যে, সতী পার্বতীর কনককুন্ডল পড়েছিল এই জায়গায়, সেই জন্য এই গ্রামের নাম কনকপুর।

আবার কনকপুর গ্রামের অপরাজিতা মা উপপীঠের দেবী বলেও এখানকার এলাকাবাসীরা মনে করেন। নির্গুনানন্দ মহারাজ এই জায়গায় সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন, সেই কারণে এই এলাকার মন্দির গুলিতে এবং গ্রামের অনেকের ঘরে তাঁর ছবিও রয়েছে।

অপরাজিতা দেবীর বেদী:

অপরাজিতা দেবীর বেদী টি প্রায় চার ফুট উঁচু এবং দেবী তার উপরে অধিষ্ঠান করছেন, মূর্তির মধ্যে কেবলমাত্র মুখমন্ডল নিয়ে অপরাজিতা মায়ের মূর্তিটি। তাছাড়া এখানে দেবী দুর্গার অন্য কোন মূর্তি করে পূজা করা হয় না।

এই পুজো দেখতে ঝাড়খন্ড, বিহার থেকেও প্রচুর ভক্তদের ঢল নামে। আলাদা করে মন্দিরের সামনে মন্ডপ তৈরি করে রাখতে হয়।

গ্রামে আরো তিনটি পূজো হলেও অপরাজিতা মায়ের মন্দিরে অপরাজিতার পূজো এলাকাবাসীর কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণও বটে। তাছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসেন এই মন্দিরে।

মন্দির চত্বর লাগোয়া এলাকায় গ্রামে মেলা বসে। সেখানে গ্রামের মানুষজনদের পাশাপাশি দূর থেকে আগত ভক্তরাও সেই মেলার আনন্দ উপভোগ করেন। দুর্গাপূজা ছাড়াও রটন্তী কালী পূজার সময় অপরাজিতা মায়ের মন্দির প্রাঙ্গণ ভক্তজনের কাছে একটি বার্ষিক মিলন স্থল হয়ে দাঁড়ায়।

কনকপুরের অপরাজিতা মায়ের মন্দিরের অবস্থান:

মুরারই থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে অপরাজিতা মায়ের মন্দির এবং তার আশেপাশে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে, যা কিনা একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন গ্রামের বাসিন্দারা।

কেন না এখানকার আশেপাশের পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ তো করেই, তার পাশাপাশি পূজা, অনুষ্ঠান এবং মেলা উপলক্ষে দূর দূরান্ত থেকে অনেক ভক্তগণ এবং পুণ্যার্থীরা এখানে এসে ভিড় জমান।

দেবী দুর্গা অনেক রূপেই পূজিতা হয়ে আসছেন, তবে বিসর্জনের সাথে সাথে তিনি যেমন কৈলাসে পাড়ি দেন, তেমনি সেই বিজয়া দশমীর তিথিতেই আবার অপরাজিতা রূপে পূজিতা হন সকলের কাছে। দেবী যেমন এক এক রূপে পূজিত হন, তেমনি এক একটি রূপের এক একটি মাহাত্ম্য।

যেমন ধরুন এই অপরাজিতা পূজা করা হয় সমস্ত রকম যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসার জন্য, সেটা কোন রণক্ষেত্র হতে পারে অথবা জীবন যুদ্ধ। সকলের জীবন হোক বিপদমুক্ত ও সুমধুর।

Leave a Comment