জগদ্ধাত্রী পূজা 2023: জগদ্ধাত্রী পূজার অজানা তথ্য যা আপনি জানেন না

হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জীবনযাত্রা চলে এক একটি পূজা পার্বণের মধ্যে দিয়ে, উৎসবের মধ্যে দিয়ে। তেমনি একটি বড় উৎসব হল জগদ্ধাত্রী পূজা। আর এই জগদ্ধাত্রী হল দেবী দুর্গার আরেকটি রূপ। তিনি হলেন হিন্দু দেবী, যাকে আমরা দেবী দুর্গার অপর রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি।

এছাড়া জগদ্ধাত্রী নামটি উপনিষদে উমা হৈমবতী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। হিন্দু বাঙ্গালীদের ধর্মীয় চিন্তাধারায় রাজসিক দেবী দুর্গা অর্থাৎ পার্বতী ও তামসিক মা কালীর পরবর্তী স্থানটি হল সত্ত্ব গুণের দেবী জগদ্ধাত্রী। তবে দুর্গাপূজা অথবা কালী পূজার তুলনায় জগদ্ধাত্রী পূজা বর্তমানে বেশি প্রচলিত। অনেক আগে থেকে এর প্রচার চলেনি।

জগদ্ধাত্রী পূজার অজানা তথ্য যা আপনি জানেন না
জগদ্ধাত্রী পূজার অজানা তথ্য যা আপনি জানেন না

প্রত্যেক বছর কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক আরাধনা অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন জায়গায়। দুর্গাপূজার মত এত বড় করে আড়ম্ভর হয়তো নাও হয়, তবে যেখানে যেখানে এই জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন রয়েছে সেখানে দুর্গাপূজার মতোই উৎসব আনন্দে ভেসে যান স্থানীয় মানুষজন।

তো চলুন তাহলে এই জগদ্ধাত্রী পূজা নিয়ে বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য সম্পর্কে জানা যাক:

জগদ্ধাত্রী নামের অর্থ:

জগদ্ধাত্রী এই শব্দটির অর্থ হল জগৎ + ধাত্রী অর্থাৎ এই পৃথিবীর বা ত্রিভুবনের ধাত্রী, পালিকা এবং এক কথায় দেবী দুর্গা বা পার্বতী কালী সহ অন্যান্য শক্তির দেবীগণ একত্রে মিলিত হয়ে জগদ্ধাত্রীর সৃষ্টি। তবে শাস্ত্র অনুসারে জগদ্ধাত্রী রূপের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক সুক্ষ্মতর ধর্মীয় দর্শন।

যেটি সাধারণ মানুষের মনকে আরো বেশি ভক্তিতে ভরপুর করে তোলে। এই পৃথিবীর সকল জীবের পালিকা এবং জগদ্ধাত্রী মাতা হিসেবে জগদ্ধাত্রী দেবীকে পূজা করা হয়।

এবার জানা যাক জগদ্ধাত্রী মায়ের রূপের বর্ণনা:

আমরা সকলেই জানি যে, মা জগদ্ধাত্রী হলেন ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা এবং সিংহবাহিনী। তিনি হাতে ধারণ করে রেখেছেন শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ। গলায় রয়েছে নাগযজ্ঞ পবীত, অর্থাৎ দেখবেন জগদ্ধাত্রী দেবীর গলায় একটি সাপ রয়েছে।

দেবীর বাহন সিংহ কোরিন্দ্রসুর অর্থাৎ হাতি রূপী অসুরের পিঠে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, দেবীর গায়ের বর্ণ উদীয়মান সূর্যের মতো, উজ্জ্বল অর্থাৎ হালকা সোনালী। দেবীর সিংহবাহনের পায়ের নিচে রয়েছে একটি হাতির মুণ্ড।

দেবী জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়ম:

বিভিন্ন জায়গায় ঘটা করে, বড় আকারে এই জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হলেও অনেকেই বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পূজা করে থাকেন। দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজার ঠিক একমাস পর কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে।

আরো অন্যান্য পূজা-পার্বনের তুলনায় জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়ম টি একটু অন্যরকম। সাধারণত দুটি প্রথায় এই পূজা হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গাপুজোর অনুকরণে এই পূজা করে থাকেন, আবার অনেকেই নবমীর দিনটিতেই তিনবার পূজার আয়োজন করেন অর্থাৎ সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী একই সাথে এই তিনটি পূজা সম্পন্ন করে থাকেন।

আবার অনেক জায়গায় দেখা যায় প্রথম অথবা দ্বিতীয় পূজার পর কুমারী পূজার আয়োজন করা হয় দুর্গাপূজার মত। জগদ্ধাত্রী পূজার বিসর্জন বিজয়া নামে পরিচিত। এমন কি এই পূজাতে পুষ্পাঞ্জলি এবং প্রণাম মন্ত্রসহ অনেক মঞ্চেরও দুর্গা পূজার সাথে অনেক বেশি মিল রয়েছে। আর হবে নাই বা কেন, জগদ্ধাত্রী হলেন দেবী দুর্গা অর্থাৎ পার্বতীর আরেকটি রূপ।

জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন:

প্রতিটি পূজা কোন না কোন এক সময় কারো হাত থেকে শুরু হয়েছিল এবং তা থেকে চারিদিকে সেই পূজার এবং সেই দেবদেবীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে সেই পূজার প্রচলন বেড়ে যায় দূর থেকে দূরান্তরে।

জগদ্ধাত্রী পুজো প্রথমে কট্টর নিয়ম অনুসারে প্রচলিত ছিল ব্রাহ্মণদের মধ্যে। সত্ত্ব গুণের প্রতীক যা কিনা ব্রাহ্মণদের একটি বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয়, আবার দেবীর গলায় যে উপবিত (সাপ) আছে তা স্পষ্টভাবেই ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের পরিচায়ক।

আবার কোন কোন মন্ত্রে দেবীকে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়ম অনুসারে দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা করতে পারবেন ব্রাহ্মণরা এবং দুর্গাপূজা করেন যারা সেই সমস্ত ক্ষত্রিয়রা এবং তম গুণধারিনী মা কালীর পূজা করে থাকেন এমন ব্যক্তিরাও কিন্তু এই জগদ্ধাত্রী দেবীর পূজা অনায়াসেই করতে পারবেন, সেটা বড় আকারে হোক অথবা বাড়িতে ছোট আকারে হোক।

এই পূজার প্রচলন থেকে পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণদের এই জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্র কে গ্রহণ করেছিলেন বনিক শ্রেণীর দল, আর সেই ইতিহাস বহন করে এখনো দুর্গাপূজায় উৎসবের বিকল্প হিসেবে জগদ্ধাত্রী পূজার উৎসব পালন করা হয়ে আসছে।

দুর্গাপূজা করতে না পারার দুঃখ থেকেই জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন:

আমরা সকলেই জানি যে নদীয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার ঘনঘটা সম্পর্কে। এখানে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন ঘটিয়েছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, নবাব আলীবর্দি খাঁ এর রাজত্ব কালে রাজার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নজরানা হিসেবে দাবি করেছিলেন।

নজরানা দিতে না পারায় তিনি রাজাকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে চলে যান, এরপর মুক্তির পর নদীপথে কৃষ্ণনগরে ফেরার সময় তিনি নদীর ঘাটে বিজয়া দশমীর বিসর্জনের বাজনা শুনতে পেয়ে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে তিনি সেই বছর দূর্গা পূজার সময় অতিক্রম করে ফেলেছেন অর্থাৎ তিনি আর দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে পারবেন না, তার জন্য তাকে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

দূর্গা পূজার আয়োজন করতে না পারায় দুঃখিত রাজা সেই রাত্রে একটি অলৌকিক স্বপ্ন দেখেন। স্বয়ং মা দুর্গা জগদ্ধাত্রী রূপে রাজা কে পরবর্তী শুক্লা নবমী তিথিতে অর্থাৎ কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী দুর্গার পূজার আয়োজন করার কথা বলেন।

তবে আর কি ! রাজা তো এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন অর্থাৎ দেবী দুর্গাকে আরাধনা করতে না পারায় তিনি বড়ই মনমরা হয়ে পড়েছিলেন, এইভাবেই জগদ্ধাত্রী রূপে দেবী দুর্গার পূজা করতে পেরে তিনি খুবই আনন্দ অনুভব করেন। সেই থেকেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাতে এই জগধাত্রী পূজার সূচনা হয়েছিল ১৭৬৬ সালে তার রাজবাড়ীতেই।

এছাড়াও চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা, জয়রামবাটির জগদ্ধাত্রী পূজা ইত্যাদি জায়গার জগদ্ধাত্রী পূজা গুলি খুবই জনপ্রিয়। কেননা এখানে দুর্গা পূজার মতোই খুবই বড় আকারে জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করা হয়। যেখানে মেলা বসে এবং সম্পূর্ণ দুর্গাপূজার আদলে, নিয়ম কানুন মেনে এই পূজা সম্পন্ন করা হয়। দেবী পার্বতী তিনি বিভিন্ন রূপে পূজিত হন সকলের কাছে। পৃথিবীর সকল সন্তানের মঙ্গল সাধন করতে তিনি মর্ত্যে আসেন বিভিন্ন রূপে, পূজিতা হন সকলের কাছে।

Leave a Comment