জগদ্ধাত্রী পূজা 2023: চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার এই অজানা তথ্য আপনার জানা আছে কি?

বাঙালির জীবন প্রতি পদে পদে এক একটি উৎসব অনুষ্ঠানের সাথে কেটে যায়। তেমনি একটি বড় উৎসব হলো জগদ্ধাত্রী পূজা। হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে পালিত হয় জগদ্ধাত্রী পূজা। তন্ত্র বা বৌদ্ধ তন্ত্র মতে ও পূজা করার উল্লেখ রয়েছে এই জগদ্ধাত্রী পূজা সম্পর্কে।

তবে জগদ্ধাত্রী পূজা কৃষ্ণনগর এবং চন্দননগরে খুবই ধুমধাম ভাবে পালন করা হয়। আর চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা মানেই তা কিন্তু অনেকখানি উৎসাহ আর উদ্দীপনার পূজা। তার সাথে সাথে আলোর শহর মানে কিন্তু চন্দননগরের নাম প্রথমেই আসে। স্থানীয় শহর কলকাতা ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে আলোর সাজের জন্য বিখ্যাত হল চন্দননগরের কারিগররা।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার এই অজানা তথ্য আপনার জানা আছে কি?
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার এই অজানা তথ্য আপনার জানা আছে কি?

জগদ্ধাত্রী পূজার সময় সম্পূর্ণ শহর এক আলোর উৎসবে মেতে ওঠে। বিভিন্ন ধরনের আলো, লাইটিং আর আলোর সাজ দিয়ে সাজানো হয় সমগ্র শহরটাকে। চারিদিকে ধুপ, ধুনো আর ফুলের গন্ধতে ম ম করে ছোট্ট সুন্দর সাজানো শহরটি।

তবে বিখ্যাত এই চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা সম্পর্কে এমন অনেক অজানা তথ্য রয়েছে, যেগুলি সম্পর্কে হয়তো অনেকেই জানেন না। আর এই তথ্যগুলি পৌরাণিক, ঐতিহাসিক এবং লোককথার সাথে জড়িত, যেগুলি শুনতে খুবই আকর্ষণীয় লাগে।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, চন্দননগরের বিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পূজা নিয়ে কিছু অজানা তথ্য সম্পর্কে:

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার ইতিহাস:

একসময় চন্দননগর ছিল বাঙালি বাবুয়ানার উইকেন্ড অথবা সপ্তাহ শেষে বিদেশ ভ্রমণের সেরা ঠিকানা। ফরাসি সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট না হলেও এই শহর এখনো কিন্তু ফরাসি ভাষার কদর রাখে।

আভিজাত্য না থাকলেও সেই জায়গায় আকর্ষণ বেড়েছে বিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পুজোর। হৈমন্তিকার আরাধনায় এই শহর যেন এক প্রাণবন্ত আনন্দে মেতে ওঠে, দূর দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই চন্দননগরে ছুটে আসেন জগদ্ধাত্রী পূজার অনুষ্ঠান দেখতে।

হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে পালিত হয় জগদ্ধাত্রী পূজা। তবে আরও অন্যান্য জায়গার সাথে সাথে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা খুবই জনপ্রিয় এবং চারিদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে।

দুর্গা পুজোর মতোই এই ফরাসি শহরে জগদ্ধাত্রী পূজা করা হয়, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় পূর্ব ভারতের চন্দননগর একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই সময় বাংলায় ফরাসিদের শাসন চলছে।

চুঁচুড়ায় ওলন্দাজ, হুগলিতে ব্রিটিশ এবং চন্দননগরের ফরাসিরা। সেই সময় ফরাসিরা বাণিজ্য করা শুরু করলে বাংলার মানচিত্র কলকাতাকেও হারিয়ে দেয়, সেই সময় বাংলার রাজধানী কলকাতা নয় বরং চন্দননগরই ছিল বাংলার একমাত্র সম্বল।

হুগলি নদীকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে। বলা যেতে পারে এই সাজানো-গোছানো শহরটি বাংলার অন্যতম শস্য ভান্ডার ছিল। বর্তমানে যে জায়গায় চাউলপট্টি ঠাকুর টি পূজা করা হয় সেখানে বাণিজ্যের দিক থেকে দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল সকলের কাছে।

চাউলপট্টির জগদ্ধাত্রী পূজা:

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই চাউলপট্টির জগদ্ধাত্রী পুজো টি প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরানো, স্থানীয়দের কথা অনুসারে জানা যায় এখানকার জগদ্ধাত্রী ঠাকুরকে শহরের আদি মা হিসেবে ডাকা হতো।

ইতিহাস অনুসারে এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন ফরাসি দেওয়ান ইন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী তিনি তৎকালীন চাউলপট্টির সাধারন ব্যবসায়ী থেকে নিজের উপস্থিত বুদ্ধির জোরে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণকারী ইন্দ্রনারায়ন দেওয়ানের কাজ ছেড়ে মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে হিসেব রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত হন। এই চাউলপট্টি থেকেই তিনি নিজের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এবং ধীরে ধীরে ফরাসিদের সঙ্গে খুব সুন্দর একটা ওঠাবসা এবং সু-সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তাঁর।

ইতিহাসের তথ্য অনুসারে চাউলপট্টি ছিল সেকালের বাংলার শস্য ভান্ডার। লক্ষীগঞ্জের বাজারে ছিল ১১৪ টি ধানের গোলা যার এক একটিতে ৬ হাজার মন করে ধান রাখা যেত। শুধুমাত্র ১৭৩০ সালে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল আড়াই মিলিয়ন পাউন্ড।

ইন্দ্রনারায়ণ ব্যবসার সাথে সাথে সমাজসেবার কাজেও নিযুক্ত থাকতে।ন সময় সময় কৃষ্ণচন্দ্র ও ইন্দ্রনারায়ন বন্ধু হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার অনুকরণ করেই চন্দননগরে তিনি এমন একটি পূজার প্রবর্তন করেছিলেন যা বর্তমানে সকলের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

তবে এই জগদ্ধাত্রী পূজা কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক। তবে স্থানীয় মানুষজনদের মতামত অনুসারে এই পুজো প্রায় ৩০০ বছরের বেশি পুরানো অর্থাৎ অনেক বছর আগে থেকে এই পূজা হয়ে আসছে।

জগদ্ধাত্রী পূজার পৌরাণিক কাহিনী:

মার্কন্ডেয় ও পুরাণে দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী এক একজন অভিন্ন দেবী হিসেবে পরিচিত। তবে “জগদ্ধাত্রী দুর্গায় নমো” মন্ত্রে জগদ্ধাত্রী পূজিত হন। আর সেই কারণে জগদ্ধাত্রী দেবী দেবী দুর্গার আরেকটি রূপ হিসেবে ধরা হয়। জগৎকে যিনি ধারণ করে আছেন তিনি হলেন জগদ্ধাত্রী। জগদ্ধাত্রী হলেন চতুর্ভূজা, তার হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, ধনু এবং বাণ।

দেবী সিংহ বাহিনী, রক্তাম্বরা, গায়ের বর্ণ উদিত সূর্যের আভার মতো, গলায় ঝুলছে নাকযজ্ঞপবিত। পুরানে আছে দেবী বধ করেছিলেন করিন্দ্রাসুর কে আর এখানে দেবীর মূর্তিতে অসুর হস্তি রূপে রয়েছে। যেটা দেবীর সিংহের পায়ের নিচে রয়েছে।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার কিছু রীতি:

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে পূজা অর্চনা সম্পন্ন করা হয়। তবে নিয়ম নীতি সবসময় এর জন্য একই থাকে। তবে চন্দননগরে এই জগদ্ধাত্রী পূজায় আদি মায়ের পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে করা হয়ে থাকে।

স্থানীয় মানুষজনদের সহযোগিতায় এখানকার জগদ্ধাত্রী পূজা আড়ম্বরপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা হয়। ষষ্ঠীর দিন থেকে শাড়ি ও সোনা রুপার গয়না দিয়ে সাজানো হয় দেবী জগদ্ধাত্রী কে। অনেক ভক্তরা আসেন, যারা নামিদামি বেনারসি শাড়ি দান করার মানত করে থাকেন।

শুধু তাই নয় মানত হিসেবে এখানে সোনা এবং রুপো দান করা হয় এবং সোনা দিয়ে ও রুপা দিয়ে তৈরি করা গয়না দিয়েও দেবী জগদ্ধাত্রীকে সাজানো হয়। সপ্তমীর দিনে সাতটি বিশাল মাপের থালায় নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।

এরপর সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিনই ছাগল বলি দেওয়া হয়। আখ, কুমড়ো, বলি দেওয়ার রীতি এখন বর্তমান। এর পাশাপাশি দেবী জগদ্ধাত্রীকে সন্তুষ্ট করতে অষ্টমীর দিন ১০৮ টি রক্তপদ্ম নিবেদন করার রীতিও রয়েছে। যা কিনা বর্তমানেও এই রীতি প্রচলিত।

তবে যাই হোক না কেন, প্রতিটি উৎসবের পেছনে থাকে এক লম্বা ইতিহাস। সেই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে গেলে অনেক কিছুই জানা যায়। কিন্তু চন্দননগরের এই জগদ্ধাত্রী পূজা খুবই জনপ্রিয় সকলের কাছে। এখানকার আলোকসজ্জা এবং দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য পূজার নৈবেদ্য ও রীতি প্রথা গুলি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ তো করেই আর সকল ভক্তদের এখানে আসার জন্য আকর্ষিতও করে।

Leave a Comment