মুসলিম আইন কি? বিভিন্ন নিয়ম কানুন ও মুসলিম আইনের ঐতিহ্য

মুসলিম আইন কি? এই আইনের মধ্যে কি কি অধিকার আছে? মুসলিম আইনের বিভিন্ন নিয়ম ও কানুনগুলি কি কি? আসুন জেনে নিন মুসলিম আইন সম্পর্কে সবকিছু বিস্তারিত।

প্রতিটি ধর্ম অনুসারে এক এক ধর্মের এক এক রকমের ঐতিহ্য আমরা লক্ষ্য করি। আর সেই ঐতিহ্য বিশেষ কিছু নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠান এর মধ্য দিয়ে আমরা সেই ধর্মকে চিনতে পারি।

মুসলিম আইন কি? বিভিন্ন নিয়ম কানুন ও মুসলিম আইনের ঐতিহ্য
মুসলিম আইন কি? বিভিন্ন নিয়ম কানুন ও মুসলিম আইনের ঐতিহ্য

তেমনি ইসলাম অথবা মুসলিম আইন কানুন এর ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেকেই হয়তো অবগত নন। তাহলে আজকের এই আর্টিকেলটিতে জানা যাক মুসলিম আইন কানুন সম্পর্কে কিছু তথ্য সম্পর্কে:- 

মুসলিম আইন কানুন:

উত্তরাধিকার এবং মুসলিম আইন কানুনের গঠন ইসলামী আইন অনুসারে চার ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে যেমন ধরুন:-

১) পবিত্র কোরআন শরিফ।

২) সুন্নি, অর্থাৎ পয়গম্বর এর অনুগামী।

৩) ঐক্যমত অর্থাৎ কোন বিদ্বান পুরুষের কোন বিশেষ বিন্দুর উপর নির্ণয়ের সহমতি।

৪) ঈশ্বর অর্থাৎ শুধু মাত্র একজন পরমেশ্বর দ্বারা যে সমস্ত নির্দেশ গুলি দেওয়া হয়েছে সে গুলি অনুসরণ করা।

মুসলিম আইন কানুন দুই প্রকারের উত্তরাধিকারী দের সম্পত্তির ভাগীদার দের চিহ্নিত করে থাকে, যা কিনা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে অধিকার আর অবশিষ্ট যে উত্তরাধিকারী অথবা ভাগীদার থাকবে, তার অধিকার নিয়ে নেওয়ার পর যে সম্পত্তি বাদ পড়ে থাকে সেই সম্পত্তিতে অধিকার পেতে পারেন কোন ব্যাক্তি।

সম্পত্তির ওপর যাদের অধিকার থাকবে তারা অথবা ভাগীদার দের সংখ্যা ১২ রকম, সেগুলি হল:-

  • ১) স্বামী,
  • ২) স্ত্রী,
  • ৩) মেয়ে,
  • ৪) একমাত্র ছেলের মেয়ে অথবা ছেলে ছেলে এই সম্পত্তিতে ভাগ পেতে পারেন,
  • ৫)  পিতা,
  • ৬) পৈত্রিক দাদু,
  • ৭) মা,
  • ৮) দিদা,
  • ৯) বড় বোন,
  • ১০) নিজের বংশের অন্য কোন বোন,
  • ১১) গর্ভে রয়েছে এমন ভাই,
  • ১২) গর্ভে রয়েছে এমন বোন।

প্রত্যেক ভাগীদার তাদের অধিকার এবং সম্পত্তির ভাগ নিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এমন মামলাতে দম্পতি অথবা স্বামী-স্ত্রী, স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ ভাগ নিতে পারেন।

একজন স্বামী তার স্ত্রীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার এর মামলাতে যেখানে বংশের মধ্যে কোনরকম ভাগীদার যদি না থাকে, সে ক্ষেত্রে সম্পত্তির অর্ধেক ভাগ নিয়ে থাকেন, অন্যথা এক-চতুর্থাংশ ভাগ নেওয়া যেতে পারে।

একমাত্র মেয়ে অর্ধেক ভাগ নিতে পারেন, যেখানে মৃত ব্যাক্তি একের বেশি অধিক কন্যা সন্তান রেখে যান তো, সমস্ত মেয়েরা সম্পূর্ণ রূপে দুই-তৃতীয়াংশ সম্পত্তির ভাগ নিতে পারেন।

যখন কোন মৃত ব্যাক্তি ছেলে অথবা মেয়ে দের সম্পত্তি রেখে যান, সে ক্ষেত্রে মেয়েদের ভাগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শেষ হয়ে যায়। তার পরিবর্তে সেই মেয়েরা অবশিষ্ট রূপে পরিণত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সেই সম্পত্তি যদি ভাগ করা হয় সেখানে মেয়েরা যে সম্পত্তি পেয়ে থাকেন তার দ্বিগুণ সম্পত্তি ছেলেরা পাবেন, এমনটা নিশ্চিত হয়ে যায়।

মুসলিম আইন কানুন অনুসারে বিনা ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার এবং ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার: 

বিনা ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার তে মুসলিম পার্সোনাল ল (ভারত) আবেদন অধিনিয়ম 1937 জারি করা হয়েছে। অপরদিকে এমন পরিস্থিতিতে অথবা এমন মামলাতে যেখানে যেখানে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে গিয়েছে অথবা সেই ব্যক্তির মৃত্যুর আগে তার ঐতিহ্য বানিয়ে রেখেছেন, যেমন ধরুন শিয়া ও সুন্নি এর জন্য জারি করা হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শরীয়ত কানুন অনুসারে।

এমন মামলাতে যেখানে সম্পত্তির বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ, চেন্নাই, আর মুম্বাই রাজ্য তে অচল সম্পত্তিতে মুসলিম দের ভারতীয় উত্তরাধিকার অধিনিয়ম 1925 অনুসারে বাধ্য করা হয়েছে, আর এটি শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার এর প্রজনন এর জন্যই করা হয়েছে।

জন্মের অধিকার:

মুসলিম আইন কানুন অনুসারে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পরেই কিন্তু আসে। যেকোনো মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা কোন বাচ্চা কে তার জন্মের পরপরই সেই সম্পত্তির অধিকার কখনোই মেলে না। যদি কোন উত্তরাধিকারীর কোন পূর্বপুরুষের মৃত্যুর পরও থাকে তাহলে সেটা আইন অনুসারে উত্তরাধিকারী হয়ে যায়।

আর এই জন্য সম্পত্তিতে ভাগীদার এর অধিকার হয়ে থাকে। তাছাড়া স্পষ্ট ভাবে সেই সম্পত্তির অধিকারী অথবা উত্তরাধিকারী তার পূর্বপুরুষের মৃত্যুর পর যদি না বেঁচে থাকেন, তাহলে সেই সম্পত্তির অধিকারী হিসেবে বা তার ভাগ পাওয়ার জন্য কোনরকম অধিকার থাকে না।

সম্পত্তির বিতরণ:

মুসলিম আইন কানুন অনুসারে সম্পত্তির বিতরণ দুই রকম ভাবে করা যেতে পারে, প্রতি ব্যক্তি অনুসারে বিতরণ অথবা প্রতি শাখা অনুসারে বিতরণ।

সুন্নি কানুন অনুসারে সম্পত্তি প্রতিবেদন অনুসারে বিতরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই বিধি অনুসারে পূর্বপুরুষ যারা রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারী দের মধ্যে সমান সমান ভাবে ভাগ করে দেওয়া হয় অথবা বিতরণ করে দেওয়া হয় এইজন্য প্রত্যেক ব্যক্তির ভাগ সেই উত্তরাধিকারি এর সংখ্যার উপর নির্ভর করে থাকে।

শিয়া মুসলিম আইন কানুন অনুসারে শাখা বিতরণ বিধি বেশি মান্যতা পেয়ে থাকে। সম্পত্তি এবং ঐতিহ্য অনুসারে আর সম্পত্তি বিতরনের পদ্ধতি অনুসারে পূর্বপুরুষ দের রেখে যাওয়া সম্পত্তি সমস্ত উত্তরাধিকারী দের মধ্যে শাখা অনুসারে বিতরণ করা হয়, সেই কারণে এদের উত্তরাধিকারী এবং সে উত্তরাধিকারীর শাখার সংখ্যার উপরে নির্ভর করে সম্পত্তি ভাগাভাগি করা হয়ে থাকে।

মহিলাদের অধিকার: 

মুসলমান পুরুষ আর মহিলাদের অধিকারের মধ্যে কোনরকম ভেদাভেদ নেই। নিজের পূর্বপুরুষদের মৃত্যুর পর কোন ছেলে অথবা মেয়ে দুজনেই তাদের অধিকারের মধ্যে পাওয়া সম্পত্তির আইন অনুসারে উত্তরাধিকারী হতে পারেন। সেক্ষেত্রে কোনভাবেই তাদের আটকানো যাবে না।

তাছাড়া সাধারণত এই বিষয় সম্পর্কে জানা যায় যে, মহিলা উত্তরাধিকারীর সম্পত্তির ভাগের মাত্রা পুরুষ উত্তরাধিকারী দের সেই সম্পত্তির ভাগের অর্ধেক হয়ে থাকে। আর এর পিছনে কারণ হলো এই যে, মুসলমান কানুন আইন অনুসারে, একজন মহিলা বিয়ের পর নিজের স্বামীর কাছ থেকে মোহর আর রক্ষণাবেক্ষণের সমস্ত খরচ প্রাপ্ত করে থাকেন।

যখন কোনো পুরুষের কাছে শুধুমাত্র তার পূর্ব পুরুষেরা রেখে যাওয়া সম্পত্তি হয়ে থাকে, এছাড়াও পুরুষদের নিজেদের স্ত্রী এবং বাচ্চাদের লালন পালন করার জন্য যে কর্তব্য এবং দায়িত্ব রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অনেকখানি খরচ জড়িয়ে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সম্পত্তির ভাগ অর্ধেক হয়ে থাকে।

কোন সম্পত্তির অধিকারের জন্য বিধবার অধিকার:

মুসলিম আইন কানুন অনুসারে কোন বিধবাকে এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী থেকে কখনোই বাইরে রাখা হয় না। একজন নিঃসন্তান মুসলিম বিধবা মৃত স্বামীর শেষকৃত্য আর আইনি খরচা এবং এরপর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ অধিকারী হয়ে থাকেন। তাছাড়া সেই বিধবা যার কাছে বাচ্চা রয়েছে অথবা নাতি নাতনি রয়েছে সে ক্ষেত্রে মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে অষ্টম উত্তরাধিকারের অধিকার রয়েছে।

যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি তার রোগের কারণে বিয়ে করে থাকেন এবং পরবর্তীতে সেই রোগের জন্যই কোনরকম বিয়ের সুখ ছাড়া যদি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে সেই ব্যক্তির স্ত্রী এর কোনো রকম অধিকার থাকবে না সম্পত্তিতে।

কিন্তু যদি সেই মহিলার অসুস্থ স্বামী তাকে তালাক দিয়ে থাকেন আর পরবর্তীতে সেই রোগের কারণে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে সেই বিধবার সেই সম্পত্তি ভাগ পাওয়ার অধিকার ততক্ষণ পর্যন্ত থাকবে যতক্ষণ সেই মহিলা দ্বিতীয় বিবাহ না করছেন।

গর্ভে থাকা সন্তানের অধিকার:

যখন কোন শিশু মাতৃ গর্ভে থাকে, তাহলে তাকে কোনো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য আগে থেকেই অধিকার রয়ে যায়। তাছাড়া যখন সে জীবিত জন্মগ্রহণ করবে। ভ্রুণ অবস্থায় একটি বাচ্চাকে জীবিত ব্যাক্তি হিসেবে মানা হয়।

আর সে ক্ষেত্রে কোন সম্পত্তি যখন তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু যদি গর্ভ থেকে সেই বাচ্চা জীবিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ না করে, তাহলে সেখানে কোনরকম সম্পত্তির অধিকার থাকবে না সেই বাচ্চার। আর এটা মনে করা হবে যে, গর্ভে কোনরকম সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কখনোই ছিল না।

অবৈধ সম্পত্তির অধিকার:

যখন একজন মৃত মুসলিম ব্যক্তির মুসলিম আইন অনুসারে কোনরকম সম্পত্তির উত্তরাধিকারী না থেকে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তির সম্পত্তি সরকার দ্বারা অবৈধ হিসেবে সরকারের তত্ত্বাবধানে রেখে দেওয়া হয়।

বিশেষ বিবাহ অধিনিয়ম 1954 অনুসারে বিবাহ: 

যেখানে একজন মুসলিম বিশেষ বিবাহ অধিনিয়ম 1954 অনুসারে নিজে বিবাহ করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্য অনুসারে প্রজনন এর ক্ষেত্রে বা প্রজননের জন্য মুসলিম আর থাকেন না, সেই অনুসারে এইভাবে একজন মুসলিমের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মুসলিম আইন কানুন অনুসারে হস্তান্তরিত করা হয় না।

এমন মুসলমান দের সম্পত্তির উত্তরাধিকার ভারতীয় উত্তরাধিকার অধিনিয়ম 1925 এর অনুসারে করা হয়ে থাকে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী মুসলিম আইন কানুন জারি হয় না।

তো এইভাবে মুসলিম আইন কানুন অনুসারে সম্পত্তির ভাগাভাগি হয়। যেখানে ছেলে-মেয়ে উভয়ের সম্পত্তির ভাগ সমান সমান থাকে। কিন্তু মোহর এবং স্বামীর সম্পত্তির ভাগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ সেখানে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সম্পত্তির অর্ধেক হয়ে থাকে।

তাই যদি কোন পুরুষের সম্পত্তি দ্বিগুণ হয় এবং বিবাহিত হয়ে থাকেন তাহলে সেই স্ত্রীর ও তেমনি অধিকার রয়েছে, যেমন অধিকার রয়েছে একজন মৃত ব্যক্তির মেয়ের।

Leave a Comment