চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতার আইন নিয়ম এবং তার শাস্তি

Medical Negligence and Law in Bengali: চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতার জন্য দুর্ঘটনা হলে কি করবেন? ভুল চিকিৎসা হলে কি করবেন? চিকিৎসার গাফিলতির ফলে ক্ষতি হলে কি করবেন? চিকিৎসায় অসাবধানতার আইনি নিয়ম ও শাস্তি সম্পর্কে জানুন। 

কথায় আছে ঈশ্বরের পরে ডাক্তারের স্থান, কেননা ডাক্তার তাদের দক্ষতা দিয়ে একটি মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। তবে এমন ঘটনা নেহাত কম নয়, যেখানে ভারতে প্রতিবছর প্রায় ৫২ লাখ চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতাবশত যেকোনো মানুষের ক্ষতি এবং মৃত্যুর কারণে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আর দেশে ৯৮ হাজার মানুষ চিকিৎসার অসাবধানতার কারণে প্রতিবছর অনুসারে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছেন।

সেদিন চলে গিয়েছে যেদিন মানুষ একেবারে অন্ধ বিশ্বাস করতেন ডাক্তারদের। চোখে কাপড় বেঁধে ডাক্তারা যা পরামর্শ দিতেন, সেই অনুসারে চলতেন। তাতে যদি নিজের শরীরের কোন ক্ষতি হতো, তাহলেও ভরসা করতেন ডাক্তারদের উপরই।

তবে বর্তমানে দিন বদলের সাথে সাথে ডাক্তারদের মধ্যে ঘুষখোর এবং বেআইনিভাবে চিকিৎসা তার সাথে অসাবধানতাবশত কোন রোগের চিকিৎসা করা তার সাথে অতিরিক্ত টাকা চার্জ করা বেড়ে গিয়েছে প্রচুর পরিমাণে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতার আইন - Medical Negligence in Bengali
চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতার আইন – Medical Negligence in Bengali

আর সেই কারণে সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে এই চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাবধানতার জন্য কিভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন !

আদালতেও ভুক্তভোগী কোন রোগের স্বপক্ষে কথা বলে থাকে, অধিনিয়ম 2015 অনুসারে। সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে, আর একটি যুবককে সম্মানিত করা হয়েছে। যেখানে সেই যুবকের চিকিৎসা চলাকালীন ডাক্তারের অক্ষমতা অনুসারে সেই যুবকের চোখের জ্যোতি চলে গিয়েছিল, সেখানে দু’কোটি টাকা পর্যন্ত ভরপাই করতে হয়েছে।

মেডিকেল অসাবধানতা কি?

যদি আমরা সাধারণ ভাষায় বলি অসাবধানতা অর্থাৎ ভালো করার জন্য যে আইন রয়েছে সে আইনকে লঙ্ঘন করা, বলতে গেলে। সে ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় যেখানে সেই সাবধানতা অবলম্বন করা তো দূরে যাক, বিপরীতে আরো এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যেখানে কোন ব্যক্তির সারা জীবনের প্রশ্ন ওঠে এবং কোন ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

আমরা সবাই জানি যে, একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ এবং ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডাক্তার কখনোই কোন রোগের বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত আর ভুল চিকিৎসা করবেন না। এমনটা বিশ্বাস প্রতিটি মানুষের মধ্যে থাকে, যখন সেই ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডাক্তার মেডিকেল অসাবধানতার কারণেই কোনো মানুষের প্রাণ পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এই মেডিকেল অসাবধানতা আইন হিসাবে জরিমানা এবং সেই ডাক্তারের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে।

তবে একজন ডাক্তারকে তখনই দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে, যখন কোন ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারবেন যে, সেই ডাক্তার কোন কোন অসাবধানতার কারণে রোগীর ভুল চিকিৎসা করেছেন অথবা সেই রোগীর মৃত্যুর জন্য ডাক্তারই দায়ী।

তবে আইন অনুসারে সমস্ত রকম শর্ত মেনে যখন কোন ডাক্তার তার প্রচেষ্টা অনুযায়ী চিকিৎসা করে থাকেন এবং সে ক্ষেত্রে কোনো রকম অসাবধানতা যদি হয়ে থাকে, তখনও কিন্তু এই ডাক্তারের দোষ দেখা হয়ে থাকে।

যদি আপনি একটি চিকিৎসা অসাবধানতার মামলাতে জড়িত থাকেন তাহলে কি করবেন ?

যদি আপনি চিকিৎসা অসাবধানতা মামলাতে জড়িত রয়েছেন তাহলে আপনি একটি সিভিল স্যুট অথবা অপরাধমূলক মামলা দায়ের করতে পারবেন।

ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে নিম্নলিখিত ধারা অনুসারে চিকিৎসা অসাবধানতার জন্য অভিযোগ দায়ের করতে পারেন :

১) ধারা 52- সম্পূর্ণ বিশ্বাস।

২) ধারা 80- আইনি কার্য সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা।

৩) ধারা 180- অধিনিয়মে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কিন্তু দোষী কোনরকম উদ্দেশ্য ছাড়াই আর অন্য কোন ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য এমনটা করা যেতে পারে।

৪) ধারা 304A- অসাবধানতার জন্য মৃত্যুর কারণ।

৫) ধারা 337- অন্য কারো জীবন অথবা নিজের সুরক্ষাকে বিপদে ফেলার কারণে।

মেডিকেল অসাবধানতার জন্য মামলা দায়ের করা:

জেলউপভোক্তা বিবাদীরা নিবারণ ফর্ম তে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন, সেখানে কম করে কুড়ি লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হিসেবে চাইতে পারেন। তবে এক কোটি টাকার বেশি কখনোই চাওয়া যাবে না।

আবার যদি মাল অথবা সেবা এর মূল্য অনুযায়ী এক কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় আয়োগ এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

আপনার দ্বারা মামলা দায়ের করার পরে ফোরাম আপনার মামলাটি তৈরি করার জন্য সেই দোষী পক্ষকে হাজির হতে বলতে পারেন।

যখন আপনি উপভোক্তা সংরক্ষণ অধিনিয়ম অনুসারে একটি উপভোক্তা মামলা দায়ের করবেন, তখন এই মামলা অপরাধমূলক মামলা কখনোই হবে না। এর মানে হলো এই মামলাতে আপনি কেবলমাত্র মুখের কথার উপরে এ মামলা দায়ের করেছেন।

মেডিকেল অসাবধানতা প্রমাণিত করতে হবে:

যে অসাবধানতার কারণে কোন মানুষের ক্ষতি হয়ে থাকবে, সেই অসাবধানতার সম্পূর্ণ প্রমাণপত্র অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এই জন্য এই মামলার ক্ষেত্রে রোগীর জন্য মেডিকেল অসাবধানতার সমস্ত প্রমাণপত্র আদালতে হাজির করতে হবে।

কে এই অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন ?

একজন উপভোক্তা অথবা যেকোনো মান্যতা প্রাপ্ত উপভোক্তা অথবা যে ব্যক্তির সাথে এমন ঘটনাও ঘটেছে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে, সে ক্ষেত্রে যে কোন ব্যক্তি এই অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।

অভিযোগ দায়ের করার জন্য কত খরচ হতে পারে ?

এই অভিযোগ দায়ের করার জন্য খুবই কম পরিমাণে আপনাকে খরচ করতে হবে অথবা চার্জ দিতে হবে।

আপিল করার কোনো সময়সীমা আছে কি ?

সমস্ত রকম মামলার নির্ণয়ের তারিখের ৩০ দিনের ভিতরে আপিল দায়ের হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একটি আপেল রাজ্য আয়োগ থেকে রাষ্ট্রীয় আয়োগ, রাষ্ট্রীয় আয়োগ থেকে সর্বোচ্চ বিচারালয় এ গিয়ে থাকে।

মেডিকেল অসাবধানতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার পর আপনি কিভাবে আগে এগোবেন ?

সবার প্রথমে আপনাকে সমস্ত রকম মেডিকেলে রেকর্ড এবং কাগজপত্র এক জায়গায় জড়ো করতে হবে। মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া এর নির্দেশ অনুসারে রোগীকে নিযুক্ত করার সময়সীমা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত রকম মেডিকেল রেকর্ড আপনাকে জোগাড় করতে হবে। একটি মেডিকেল অসাবধানতার মামলায় আইনিভাবে লড়ার জন্য আপনাকে অনেক রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

যেমন ধরুন আপনি যে ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন সেই ডাক্তারের দিক থেকে অনেক রকম অসুবিধা হতে পারে, সে ক্ষেত্রে একজন ভালো উকিল অবশ্যই নির্বাচন করে রাখুন।

মেডিকেল অসাবধানতার অপরাধের জন্য শাস্তি:

ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে ধারা 304A অনুযায়ী দুই বছরের শাস্তি এবং জরিমানা অথবা দুই বছরের জেল তার সাথে জরিমানা দুটোই একসাথে করা যেতে পারে। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে ধারা 80 এবং 88 অনুসারে জামিনের ব্যবস্থা রয়েছে।

মেডিকেল অসাবধানতার জন্য অনেক ক্ষেত্রে অনেকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। তবে অবশ্যই যদি আপনি এই মামলার বিরুদ্ধে লড়তে চান, তাহলে সমস্ত রকম মেডিকেল রেকর্ড এবং প্রমাণপত্র হাতে নিয়ে তবেই এই আইনি পথে এগোবে। না হলে পরবর্তীতে এই মামলা আপনার জীবনের সবথেকে বড় ভুল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Comment