ভারতে বিবাহের যৌতুক আইন কানুন ও শাস্তি কি? যৌতুক অধিনিয়ম জানুন

ভারতবিবাহের ক্ষেত্রে যৌতুক আইন কি? যৌতুক নেওয়ার জন্য কি কি শাস্তি দেওয়া হয়? কি কি জিনিস যৌতুকের মধ্যে পড়ে? আসুন জেনে নিন সঠিক যৌতুক অধিনিয়ম ও আইন।

যৌতুক এমন একটি শব্দ যা কিনা প্রতিটি ভারতীয় এই শব্দের সাথে পরিচিত। যে ঘরে কন্যা সন্তান রয়েছে, সেই ঘরে যৌতুক কথাটা বেশ ভালোভাবে মনে করা হয়। আর এটি দিনের সাথে সাথে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় সমাজের জন্য যা কিনা একটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাপনা তে পরিণত হয়েছে।

যে বিষয়টি বিবাহ সম্পর্কিত যে সুন্দর রীতিনীতি বিষয়টিকে একেবারে শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে এই যৌতুক প্রথা। তাছাড়া এই প্রথা কোন নতুন প্রথা নয়, কিন্তু যুগ বদলানোর সাথে সাথে এর মাত্রা বিভিন্ন ভাবে বদলাতে শুরু করেছে। কোনভাবেই কিন্তু এই প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত করা যাচ্ছে না।

ভারতে বিবাহের যৌতুক আইন কানুন ও শাস্তি কি? যৌতুক অধিনিয়ম জানুন
ভারতে বিবাহের যৌতুক আইন কানুন ও শাস্তি কি? যৌতুক অধিনিয়ম জানুন

যৌতুক প্রথা এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার জন্য বিভিন্ন রকমের আইন বানানো হয়েছে। কিন্তু তবুও সমাজে যৌতুক রয়েই গেছে। এছাড়াও মেয়ের পরিবার এমন যৌতুক দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ মুখিয়ে থাকেন।

যৌতুক আসলে কি?

যৌতুক হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে নগদ টাকা বিভিন্ন রকমের জিনিসপত্র, সম্পত্তি, জমি, বাড়ি, গাড়ি এবং আরো অন্যান্য জিনিসপত্র। যেগুলি একটি মেয়ের বিয়েতে দেওয়া হয়ে থাকে ছেলের পরিবারকে। 1961 তে যৌতুক নিষেধ অধিনিয়ম অনুসারে ভারতের যৌতুক প্রথা বে-আইনি বলে মনে করা হয়।

যার অনুসারে যৌতুক নেওয়া এবং দেওয়া দুটোই কিন্তু অপরাধ, আর আইনের এই বিষয়ের ক্ষেত্রে যদি আইন লংঘন করা হয়, সাজা হিসেবে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। তার সাথে সাথে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হতে পারে অথবা এর বেশিও জরিমানা দিতে হতে পারে।

যৌতুক নিষেধ অধিনিয়ম (DP) 1961:

এই আইন যৌতুকের ক্ষেত্রে সমাপ্ত করার জন্য বাধা প্রদান করতে পারে, যা কিনা বিবাহ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আসা হয়েছে এই আইন। যেখানে যৌতুক হলো এমন একটি বিষয়, যেটা উপহার হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে, যা কিনা বিবাহের আগে পূর্ব শর্ত অনুসারে এই যৌতুক দেওয়া হয়ে থাকে।

তার সাথে সাথে যদি কোনরকম আগে থেকে শর্ত অনুসারে বা পরিকল্পনা অনুসারে কোন উপহার না দেওয়া হয় সেটা কিন্তু যৌতুক হিসেবে মনে করা হয় না। কেননা একজন বাবা তার মেয়েকে বিয়েতে উপহার হিসেবে যে কোন কিছুই দিতেই পারেন।

যৌতুক চাওয়া অথবা দেওয়ার উপর ছয় মাস পর্যন্ত কারাবাস, ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে অথবা যৌতুকের যে অ্যামাউন্ট সেই অনুসারে কিন্তু জরিমানা হতে পারে। তার সাথে সাথে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেলের সাজা বাড়তে পারে।

যৌতুক এবং ভারতীয় দণ্ডবিধান (সংহিতা):

যৌতুক নিষেধ অধিনিয়ম 1961, এছাড়াও যৌতুকের বিপদ ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে ৩ টি খন্ডে শামিল করা হয়েছে। ১)  ধারা 406 (স্ত্রীধন এর আদায় করা), ২) ধারা 304b (যৌতুক হত্যা) আর ৩) ধারা 498 এ (যৌতুক চাওয়ার উপর নির্ভর করে নিষ্ঠুরতা)। এছাড়া এই আইনের সাথে কিছু বিষয় জড়িয়ে রয়েছে।

ভারতীয় দণ্ডবিধি আইপিসি (IPC) এর যৌতুক আর স্ত্রীধন ধারা 406 এর মধ্যে পার্থক্য: 

ভারতীয় দণ্ডবিধি এর যৌতুক আর স্ত্রীধন ধারা 406 এর মধ্যে পার্থক্য অনুসারে স্বামী এবং তার পরিবার সেই স্ত্রীধন আদায় করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। স্ত্রীধন হল সেই সম্পত্তি যা কিনা একজন বিবাহিত মহিলা নিজের স্বামীর ঘরে সেই সম্পত্তিকে একেবারে নিজস্ব বলে দাবি করতে পারেন।

যে সম্পত্তি সেই মহিলার পরিবার থেকে তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। আর এই স্ত্রীধন যদি স্বামীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ভোগ করার জন্য জোর করে থাকেন তাহলে এই আইন অনুসারে তা শাস্তি যোগ্য অপরাধ।

কিভাবে যৌতুকের এফ আই আর দায়ের করবেন?

এফ আই আর করার জন্য আপনি আপনার অভিযোগ সরাসরি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে পুলিশ আধিকারিক এর কাছে দায়ের করতে পারেন। এছাড়া আপনার অভিযোগ সরাসরি ওমেন সেল এ ও দিতে পারবেন।

যদি আপনি আপনার অভিযোগ আপনার কাছাকাছি পুলিশ স্টেশনে জমা করে থাকেন, তাহলে সেটি প্রথমে  উমেন সেল এ যাবে সেখানে সবকিছু বোঝাপড়ার কাজ চলবে। আর যদি তেমন কোন প্রতিফল না হয় এই অভিযোগকে কাছাকাছি কোন কোর্ট এর মাধ্যমে কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

সেখানেও চুক্তি অথবা বোঝাপড়া না হওয়ার পরিস্থিতিতে এই কেস আবার ওমেন সেল এ ফেরত আসবে। আর এর ইনচার্জ যিনি কিনা এসিপি (ACP) হয়ে থাকেন তার অর্ডার এ এফ আই আর সম্ভব হবে।

যৌতুকের কারণে সামাজিক ক্ষতি:

১) কন্যা ভ্রুণ হত্যা: আজও এমন ঘটনা প্রায় চোখে পড়ে, এই প্রথার পিছনে একটি সবথেকে বড়় কারন এই যে, যদি একজন মহিলা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন তাহলে সেই কন্যা সন্তান বাবা মায়ের সম্পত্তির উপর একটি বোঝা হয়ে থাকে।

তার সাথে সাথে তার বিয়েতে প্রচুর পরিমাণে খরচ করতে হয়। তার সাথে রয়েছে যৌতুক, আর এই ভয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কন্যা ভ্রূণ হত্যা করা হয় বলে ধারণা।

আর এই যৌতুক প্রথার জন্যই কন্যা সন্তানকে প্রথম থেকেই এমন পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য হত্যা করা হয় ভ্রুণ অবস্থায়।

২) যুবতী মেয়েদের আত্মহত্যা: কোন কোন সময় দেখা যায়, যখন বাবা-মা যৌতুক এর জন্য তাদের মেয়েদের বিবাহ দিতে পারেন না, এমন পরিবারে বেশ সমস্যা সৃষ্টি হয়।

তার কারণে সেই বিবাহযোগ্যা মেয়েদের আত্মহত্যা করার জন্য বলতে গেলে পরিস্থিতি বাধ্য করে থাকে। যার ফলে এমন সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পারে সে।

৩) মেয়েদের অশিক্ষা: বেশিরভাগ পরিবার তাদের পরিবারের মেয়েদের ভালো শিক্ষা দিয়ে থাকেন না, যাতে শিক্ষার জন্য যে টাকা-পয়সা খরচ হবে সেটি যৌতুকের জন্য বাঁচিয়ে রাখা হয় যাতে বিবাহের সময় খরচ করা যেতে পারে।

৪) মানসিক রূপে অত্যাচার: এছাড়া মেয়েদের মানসিক রূপে অত্যাচার করা হয়ে থাকে, কেননা তাদের গায়ের রং শ্যামলা, মোটা অথবা শারীরিক গঠনে কোনরকম কমতি আছে, সে ক্ষেত্রে যার ফলে বাবা মায়েদের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সেই মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার জন্য তার পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে যৌতুক দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সেই মোটা, শ্যামলা বরণ মেয়েকে বিবাহ দেওয়া যেতে পারে।

মহিলাদের দ্বারা যৌতুক আইনের অপব্যবহার:

সবসময়ের জন্য যেকোনো বিষয় এর দুটি দিক থাকে। তেমনই এই আইনের ক্ষেত্রেও কিন্তু দুটি দিক রয়েছে একটি হলো খারাপ, আরেকটি হলো ভালো। যৌতুক বিরোধী আইন মহিলাদের জন্য একটি অস্ত্র প্রমাণিত হতে পারে। আবার এটি পুরুষদের জন্য খুবই সংকটময় পরিস্থিতি প্রমাণিত হতে পারে।

মহিলাদের দ্বারা দায়ের করা সমস্ত রকম যৌতুকের মামলা কিন্তু সত্যি হয় না সব সময়। আর ৪০% এর থেকে বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে, এমন ক্ষেত্রে যেখানে যৌতুক না দিয়েও স্বামীর পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

একটি অভ্যাস হিসাবে যৌতুক ভারতীয় সমাজে খুবই গভীর ভাবে নিহিত রয়েছে। আর এই প্রথা কে সম্পূর্ণ রূপে সমাপ্ত করা কখনোই সম্ভব নয়। এই প্রথাকে সমাপ্ত করা যাবে না। কেননা এর উপরে ভারতীয় নাগরিকদের বিচার এবং মানসিকতা জড়িত রয়েছে।

ভারতের একজন ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা যেতে পারে যাতে বাবা-মা বিয়েতে সেই ছেলের জন্য একটি মোটা অঙ্কের যৌতুক এর চাহিদা রাখতে পারেন।

তবে এমন ক্ষেত্রে সব পরিবার সমান নয়, কথায় আছে অনেকে মনে করেন যে কোন মানুষ যত বেশি শিক্ষিত হবেন, তত তার জন্য বিবাহের ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে যৌতুক দিতে হবে।

তবে বর্তমানে এই যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আইন থাকার কারণে হোক অথবা ভালো শিক্ষা এবং ভালো মানসিকতার জন্য অনেক এমন পরিবার রয়েছে কোন মেয়েকে সম্পূর্ণ যৌতুক বিহীন ভাবে ধুমধাম করে বিয়ে করে নিয়ে যান, একজন সুশিক্ষিত প্রতিষ্টিত পুরুষ এবং তার পরিবার।

Leave a Comment