কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা 2023: বাড়িতে পুরোহিত ছাড়াই পূজা করুন এই পদ্ধতিতে

দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার সাথে সাথে চারিদিকের পরিবেশ নিস্তব্ধ ও নিঝুম হয়ে গিয়েছে। পার্বতী কৈলাসে ফিরে গেলেও দেবী লক্ষ্মী কিন্তু আবার এই ধরনীর বুকে ফিরে আসেন পূজা পাওয়ার জন্য। প্রতিবছরে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই কোজাগরী লক্ষ্মীপূজো পালিত হয় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে।

বলা হয় এই পূজা করলে ঘরে রাজলক্ষ্মী, ভাগ্য লক্ষ্মী, কুল লক্ষ্মী এবং যশ লক্ষ্মী অচলা থাকেন অর্থাৎ তিনি সর্বদাই ঘরেতে বিরাজ করেন। যে ঘরেতে তিনি বিরাজ করেন সেই ঘরে কোন কিছুরই অভাব থাকে না বললেই চলে।

বাড়িতে পুরোহিত ছাড়াই কোজাগরি লক্ষ্মী পূজা করুন এই পদ্ধতিতে
বাড়িতে পুরোহিত ছাড়াই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করুন এই পদ্ধতিতে

আমরা সকলেই জানি যে, ধন-সম্পত্তি এবং সৌভাগ্যের দেবী হলেন লক্ষ্মী। লক্ষ্মী মানে হলো শ্রী এবং সুরুচি, লক্ষ্মী সম্পদ আর সৌন্দর্যের দেবী। তাছাড়া লক্ষ্মীর সাথে সাথে যদি নারায়ণের পূজা করা যায় সেক্ষেত্রে আরও বেশি শুভ ফল লাভ করা যায় বলে জানা গিয়েছে শাস্ত্রমতে।

ঘরেতে যে দেবীর মূর্তি অথবা পট থাকে সেটা যদি পদ্মফুলের উপরে লক্ষ্মীর বিরাজ করার ছবি অথবা মূর্তি থাকে, সেক্ষেত্রে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় ধনসম্পদ ও সুখ শান্তি বিরাজ করে সর্বদাই। তিনি পুষ্টি রুপা, পিঙ্গল বর্ণা, ষষ্ঠী হস্তা, হিরন্ময়ী, সুবর্ণা, হেম মালিনী, প্রভৃতি নামে দেবী লক্ষ্মীকে ডাকা হয় এবং অনেকেই তাকে এইসব নামেই চেনেন।

যে কোন পূজায় পুরোহিতের প্রয়োজন পড়ে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে পুরোহিত দিয়ে পূজা করা সম্ভাব হয়ে ওঠে না। তাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা নিজে থেকে কিভাবে করতে পারবেন তা নিয়ে থাকে অনেক চিন্তা।

পুরোহিত ছাড়াই কিভাবে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করবেন:

তবে নিজের বাড়িতে পুরোহিত ছাড়াই কিভাবে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করবেন, চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক:

বাঙালির ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মী পূজিতা হন। দেবীপক্ষের শেষের এই পূর্ণিমাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশ কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার প্রচলন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পূজা হয় মূলত মাটির প্রতিমা করে কিন্তু বাংলাদেশ পূজা করা হয় কোন সরায় লক্ষ্মীর মূর্তি এঁকে।

পুরোহিত ছাড়াই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা সম্পন্ন করুন নিম্ন লিখিত রীতি গুলি মেনে:

১) আমরা আগেই জেনেছি লক্ষ্মী খুবই শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন। সেক্ষেত্রে লক্ষ্মীর ধ্যান করে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা যায়। লক্ষ্মী পূজার পদ্ধতি হিসেবে শুদ্ধ আসনে বসতে হবে এবং শুদ্ধ মন নিয়ে পঞ্চ দেবতার পূজা করতে হয়।

২) প্রত্যেক দেব-দেবীর একটা নিজস্ব কিছু রীতি, নীতি এবং মন্ত্র পাঠ, পূজার আয়োজন সবকিছু এক এক রকমের হয়। পূজার সময় সঠিকভাবে পূজা করাটাও একটা মহৎ পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়। কেননা সেই সময়টাকে শুভ সময় বলে বিবেচনা করা হয়।

পূজার মন্ত্র পাঠ করতে হবে সুষ্ঠুভাবে, সেখানে যেন কোনো রকম বিচলিত ভাব না থাকে। পূজো অর্চনা জেনে নিয়ে করা ভালো, তবে না জানা থাকলে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। আর সে ক্ষেত্রে মঙ্গল হওয়ার পরিবর্তে অমঙ্গল হতে পারে।

৩) লক্ষ্মী পূজাতে পঞ্চ উপচার, দশ উপাচার আলাদা ১৬ টি উপাচারে করা হয়ে থাকে। পূজার মৌলিক নীতি হিসেবে লক্ষীর ধ্যান, পূজা, মন্ত্র পাঠ, পুষ্পাঞ্জলি এবং প্রণাম মন্ত্র দিয়ে পূজা অর্চনা করতে হয়। তারপরে অবশেষে বিসর্জন দিতে হয়।

৪) অনেক প্রাচীনকাল আগে থেকে মা লক্ষ্মী দেবীর পূজা প্রচলিত কিছু আচার অনুষ্ঠান অনুসারে করা হয়ে থাকে। প্রতিটি পূজায় স্নান করে শুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তেমনি কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় স্নান করে শুদ্ধ হয়ে গায়ত্রী মন্ত্র ১০৮ বার জপ করলে তিনি খুবই সন্তুষ্ট হন বলে জানা যায়।

৫) এখনো গ্রাম বাংলা থেকে শুরু করে শহর অঞ্চলে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন চালের গুঁড়ো দিয়ে দেবী লক্ষীর পায়ের চিহ্ন রাখা হয় ঘর থেকে শস্য ভান্ডার পর্যন্ত। লক্ষ্মী পূজার দিন দেবীর পায়ের চিহ্ন আঁকা খুবই ভালো। প্রতিদিন না পারলেও বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার এবং মা লক্ষ্মীর পুজোর তিথি থাকলে সেটা অবশ্যই পালন করা জরুরী, সেক্ষেত্রে দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ সেই বাড়িতে সর্বদাই বর্ষিত হয়।

৬) প্রদীপ, ধুপ ছাড়া কোন পূজাই সম্পূর্ণ হয় না। যেহেতু সন্ধ্যের পরে হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, সেক্ষেত্রে লক্ষ্মী প্রতিমা অথবা পট যাই বলুন না কেন, যেভাবেই পূজা হোক সেখানে প্রতিমার সামনে দুটি ঘি এর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা মঙ্গল জনক আর এর সঙ্গে পদ্মফুল, নারকেল এবং নারকেল দিয়ে তৈরি কোন মিষ্টান্ন ও ক্ষীর, নৈবেদ্য দিলে দেবী লক্ষ্মী খুবই প্রসন্ন হন।

শুধুমাত্র কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় নয়, বৃহস্পতিবার যে লক্ষীপূজা হয় অথবা শুক্রবার যে লক্ষী পূজার তিথি থাকে যদি সেই পূজা ভক্তিভরে করতে পারেন সে ক্ষেত্রেও এই ধরনের রীতি আপনি পালন করতেই পারেন।।

৭) ঠাকুর ঘরের ঠাকুরের সিংহাসনে কড়ি এবং শঙ্খ রাখা খুবই শুভ গৃহস্থ বাড়ির কল্যাণের জন্য। ভক্তি ভরে যে কোন পূজায় আপনি মঙ্গল সাধন করতে পারবেন আপনার এবং আপনার পরিবারের সকলের জন্য এবং বাড়ির জন্য।

৮) লক্ষ্মীপূজায় আপনি পুরোহিত ছাড়াই নিজে থেকেই ভক্তি রেখে সারারাত জাগরণ করে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করতে পারেন। তিনি এই অল্পতেই সন্তুষ্ট হন, তবে এক্ষেত্রে শোরগোল একেবারেই পছন্দ করেন না তিনি। তাই ধ্যান করাটাও আপনার এই পূজার মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চলুন এবার জানা যাক কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় কি করবেন না?

১) শাস্ত্র মতে জানা যায় লোহা দিয়ে অলক্ষী পূজা হয়, তাই লোহা দেখলে দেবী লক্ষ্মী খুবই রেগে যান। সে ক্ষেত্রে আপনার গৃহত্যাগ করে চলে যেতেও পারেন। তাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজাতে নেই যেহেতু সেটি লোহা দিয়ে তৈরি। এছাড়া অন্যান্য যেকোনো পূজার সরঞ্জাম লোহা দিয়ে তৈরি রয়েছে এমন কিছু ব্যবহার করা কোন মতেই যাবে না।

২) লক্ষ্মী পূজায় তুলসী পাতা অর্পণ করতে নেই, তবে লক্ষ্মী পূজার পরে যখন নারায়ণের পূজা করা হয় সেক্ষেত্রে একটি ফুল ও দুটি তুলসী পাতা দিয়ে নারায়ণ পূজা করা যেতে পারে।

#৩) লক্ষ্মী পূজা, কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা সন্ধ্যাবেলা সাধারনত হয়ে থাকে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা সকালবেলাতেও এই লক্ষ্মী পূজা করেন। সে ক্ষেত্রে একটা কথা খেয়াল রাখা জরুরী যে, সেই লক্ষ্মী পূজার সময়টা যেন সকাল ন’টার মধ্যে থাকে, তাহলে খুবই ভালো।

৪) কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় লক্ষ্মীর পাঁচালী পাঠ করতে কোনমতেই ভুলবেন না কিন্তু।

নিজের ঘরে দেবী লক্ষীকে সারা জীবনের মতো বেঁধে রাখার জন্য আপনি নিজেই যথেষ্ট। যদি মনে অনেকখানি ভক্তি রেখে দেবীকে ডেকে থাকেন সেক্ষেত্রে দেবী লক্ষ্মী সাড়া না দিয়ে কোন মতেই থাকতে পারবেন না।

তাই পুরোহিত ছাড়াই নিজের গৃহে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা আপনি করতে পারবেন অনায়াসেই। যেগুলোতে তিনি সন্তুষ্ট হন সেগুলি করতে পারলেই আপনার কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা খুবই সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে।

Leave a Comment