করবা চৌথ 2023: দাম্পত্য জীবন সুখী হবে এই নিয়মে উপবাস করলে

বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো করবা চৌথ হলো এমন একটি উৎসব যেখানে সমস্ত বিবাহিত মহিলা এবং অবিবাহিত মহিলারাও ব্রত পালন করার মধ্য দিয়ে স্বামীর মঙ্গল কামনা এবং তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করে থাকেন।

কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে করবা চৌথ উৎসব পালন করা হয়। এটি সাধারণত মহিলাদের জন্য একটি বড় ধরনের উৎসব। যা কিনা তাদের অনেক মনের ইচ্ছা এবং স্বামীর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে এই ব্রত পালন করা হয়।

সংসারের সুখ, শান্তি এবং স্বামীর মঙ্গল কামনা করে তারা সারাদিন নির্জলা উপবাস করে থাকেন। সারা বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন তারা। তবে যদি করবা চৌথ ব্রত পালন করে উপবাস করে থাকেন, তাহলে এই দিন ব্রত পালনের জন্য কি কি নিয়ম পালন করা জরুরী তা সকল মহিলাদের অবশ্যই জেনে রাখা জরুরী।

করবা চৌথ: দাম্পত্য জীবন সুখী হবে এই নিয়মে উপবাস করলে
করবা চৌথ: দাম্পত্য জীবন সুখী হবে এই নিয়মে উপবাস করলে

সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে করবা চৌথ ব্রত পালন করলে আপনার সকল মনের ইচ্ছা পূরণ হবে আর যে মানুষটির উদ্দেশ্যে আপনি এই ব্রত পালন করছেন অর্থাৎ স্বামীর মঙ্গল কামনায় সম্পূর্ণ শুভ লাভ পাবেন। দাম্পত্য জীবন সুখের করার জন্য যে নিয়মগুলি আপনাকে অবশ্যই পালন করতে হবে করবা চৌথ এর এই উৎসবে।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, করবা চৌথ ব্রত পালন করার সাথে সাথে কোন নিয়ম গুলি আপনি পালন করবেন:

১) উপবাসের আগে খাবার খাওয়া:

প্রতিটি উপবাস করার আগে অবশ্যই এমন কিছু খাবার খাওয়া প্রয়োজন, যা কিনা অনেকটা সময় পর্যন্ত শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পারে। করবা চৌথ এর উপবাস সূর্যোদয় থেকে শুরু হয়ে যায় অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগে মহিলারা স্বাস্থ্যকর কোন খাবার খেতে পারেন।

সূর্যোদয়ের আগে সমস্ত বাড়িতে সারগি খাওয়ানো হয়। যার ফলে মহিলারা সারা দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে নিতে পারেন। কেননা সারাটা দিন নির্জলা উপবাসে থাকতে হয়, বলতে গেলে এক ফোঁটা পর্যন্ত পান করা যায় না।

২) অবিবাহিত মহিলাদের জন্য করবা চৌথ এর উপবাস:

শুধুমাত্র যারা বিবাহিতা মহিলা রয়েছেন তাদের জন্য করবা চৌথ ব্রত, তা কিন্তু নয়। যেসব মহিলাদের বিবাহ স্থির হয়ে রয়েছে তারাও কিন্তু তাদের হবু স্বামীদের জন্য তাদের মঙ্গল কামনা করে এই উপবাস রাখতে পারেন।

তবে এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখা জরুরী যে, অবিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে চাঁদ না দেখেই উপবাস ভঙ্গ করা যেতে পারে।

৩) প্রথমবার করবা চৌথ ব্রত পালন:

এমনও অনেক মহিলা রয়েছেন যারা কিনা প্রথম এই ব্রত পালন করছেন, এক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই সারাদিন নির্জলা উপবাস করে থাকাটা অনেকটাই কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

সে ক্ষেত্রে ফলের রস খেতে পারেন, চাঁদ উদয়ের আগে এই উপবাসে জল পান করা যাবে না, তবে মহিলারা অসুস্থ হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে জল পান করানো যেতেই পারে। কেননা ব্রত পালনের আগে জীবন বাঁচানো টা জরুরী, তাই না !

৪) স্বামীদের করবা চৌথ এর উপবাস:

অবাক হলেন নিশ্চয় !  শুনতে অবাক লাগলেও শাস্ত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, যদি কোন বছর কোন মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তার স্বামী সেই করবা চৌথ এর ব্রত পালন করতে পারেন অথবা উপবাস রাখতে পারেন। বর্তমানে এই প্রচলিত প্রথায় এসেছে অনেকখানি পরিবর্তনের ছোঁয়া।

স্ত্রীর জন্য স্বামীরাও করবা চৌথ এর উপবাস রাখতে পারেন। আর এটা হবে নাই বা কেন ? স্ত্রীরা যদি স্বামীদের জন্য এতখানি কষ্ট করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামীদেরও উচিত স্ত্রীদের জন্য এমন উপবাস পালন করা, কি বলেন ?

৫) শাশুড়ির দেওয়া উপহার:

এই ব্রত তে একটি বিশেষ আকর্ষণ হল প্রতিটি মহিলাকে অর্থাৎ বিবাহিত মহিলাকে তাদের শাশুড়িরা উপহার দিয়ে থাকেন। শাড়ি, গয়না, মেহেন্দি, সাজগোজের বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী দেওয়া হয়।

এই উপবাসে বিভিন্ন ধরনের কাহিনী শোনানোর সময় শস্য এবং মিষ্টি একসঙ্গে রাখতে হয়। আর সেইসব কাহিনী শোনার পর পুত্রবধূকে শাশুড়িরা কিছু উপহার প্রদান করেন।

৬) ব্রত পাঠ শ্রবন করা:

প্রতিটি উৎসবে ব্রতকথা পাঠ করা অথবা শোনা অনেক খানি পুণ্য অর্জনের কাজ। সে ক্ষেত্রে করবা চৌথ ব্রত পালন করে সেই ব্রত পাঠ শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বিশ্বাস করা হয় যে, করবা চৌথ এর গল্প শুনলে বিবাহিত মহিলারা অনেকখানি খুশি থাকেন, তাদের ঘরে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি আসে।

৭) উজ্জ্বল রঙের পোশাক:

উৎসব মানেই রংবেরঙের পোশাক, আলো, ফুল এবং আরো অন্যান্য জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি। তাই এই দিনে মহিলাদের জরুরী হবে উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরিধান করা। যেমন ধরুন লাল, হলুদ এবং আরো যেসব উজ্জ্বল রং রয়েছে সেগুলি পরা।

এই দিন প্রতিটি মহিলাদের যেন নববধূর মতো দেখতে লাগে। আর এটাই এই ব্রত পালন করার জন্য খুবই জরুরী। সেই কারণে প্রতিটি মহিলা এই দিন নিজেদেরকে সাজানোর জন্য অনেকটা সময় ব্যয় করে থাকেন।

৮) পূজার থালা সাজানো:

করবা চৌথ ব্রত পালন করার পাশাপাশি পূজার থালা সাজানোর জন্য অনেকটা সময় লেগে যায়। সেই থালিতে থাকে জলের পাত্র, একটি চালুনী, জ্বলন্ত প্রদীপ, ফুল, চন্দন আর অন্যান্য পূজার সামগ্রী এবং মিষ্টি যা কিনা চাঁদ দর্শন করার পর স্বামীর হাত থেকে এগুলি মহিলাদের নিতে হয়।

আর জলের পাত্র থেকে জল পান করে এই উপবাস ভঙ্গ করতে হয়, তাও আবার স্বামীর হাত থেকে।

৯) চাঁদ উদয়ের আগে শিবের পূজা:

শিবের মতো বর পাওয়ার জন্য মেয়েরা যেমন মহা শিবরাত্রি পালন করে থাকেন, তেমনি এই করবা চৌথ ব্রত তেও সন্ধ্যার সময় চাঁদ উদয় হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা আগে পূজার থালি সাজিয়ে শিবের পূজা করে থাকেন মহিলারা।

পূজার সময় এমন ভাবে বসা জরুরী যেন মহিলাদের মুখ পূর্ব দিকে থাকে। এরপর চাঁদ যখন উদয় হবে তখন চাঁদকে পূজা করে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হয়।

তার সাথে সাথে স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করে, স্বামী ও বাড়ির বড়দের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে হয়। আর সব থেকে যেটা জরুরি সেটা হল সারাদিন নির্জলা উপবাস থাকার পর ব্রত পালন করার শেষে স্বামীর হাতের জল পান করে সেই উপবাস ভঙ্গ করতে হয়।

প্রতিটি বিবাহিত মহিলা এবং বিবাহ স্থির হয়ে রয়েছে এমন মেয়েদের জন্য করবা চৌথ ব্রত খুবই পবিত্র একটি উৎসব। যে উৎসবের সকল মনস্কামনা জানিয়ে প্রাণের স্বামীর জন্য ঈশ্বরের কাছে সমস্ত কিছু যা কিছু শুভ আছে সবটুকু চেয়ে নিতে পারলেই যেন ভালো হয়। তাই এই উৎসব খুবই ধুমধাম ভাবে পালন করা হয়ে থাকে।

প্রতিটি মানুষ চাইবেন তাদের বিবাহিত জীবন অর্থাৎ দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। তাই করবা চৌথ ব্রত পালন করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলি অবশ্যই খেয়াল রাখা জরুরী। তবে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মেলবন্ধন, ভালোবাসা অটুট থাকার ক্ষেত্রে নিজেদেরকেও অনেকখানি ভূমিকা পালন করতে হয়।

স্বামী এবং স্ত্রী দুজনেই যদি দুজনের সুবিধা-অসুবিধা বুঝে থাকেন তাহলে সে ক্ষেত্রে কোন কিছুই তাদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারবে না। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, সুখের হোক সকলের দাম্পত্য জীবন। আর আমার তরফ থেকে রইল শুভ করবা চৌথ এর প্রীতি, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

Leave a Comment