জওহরলাল নেহেরু জীবনী 2022 – ইতিহাস, পরিবার এবং স্বাধীনতা আন্দোলন কার্যক্রম

জওহরলাল নেহেরু কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? জওহরলাল নেহেরু কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও জওহরলাল নেহেরু সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Jawaharlal Nehru in Bengali)।

জওহরলাল নেহেরু ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৬৪ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। নেহেরু নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত পরিচালনার ক্ষেত্রে মুখ্য দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন।

জওহরলাল নেহেরু মোট পাঁচ বার ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জওহরলাল নেহেরুর অবদান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জওহরলাল নেহেরু জীবন পরিচয় - Jawaharlal Nehru Biography in Bengali
জওহরলাল নেহেরু জীবন পরিচয় – Jawaharlal Nehru Biography in Bengali

তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, আদর্শবাদী, পন্ডিত, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং কূটনীতিবিদ জওহরলাল নেহেরু ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।

এছাড়া লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন খুবই পরিচিত। ইংরেজিতে লেখা জওহরলাল নেহেরুর তিনটি বিখ্যাত বই “একটি আত্মজীবনী”, “বিশ্ব ইতিহাসের কিছু চিত্র” এবং “ভারত আবিষ্কার” এই তিনটি বই চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর জীবনী সম্পর্কে: 

জওহরলাল নেহেরুর জীবনী:

  • সম্পূর্ণ নাম: জওহরলাল নেহেরু
  • জন্ম তারিখ: ১৪ ই নভেম্বর ১৮৮৯ সাল
  • জন্মস্থান: এলাহাবাদ, ভারত
  • পিতার নাম: মতিলাল নেহেরু
  • মাতার নাম: স্বরূপ রানী নেহেরু
  • সন্তান: ইন্দিরা গান্ধী
  • পেশা: আইন ব্যবসায়ী, রাজনীতি
  • কাজের মেয়াদ: ১৫ ই আগস্ট ১৯৪৭ সাল থেকে ২৭ শে মে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত
  • ধর্ম: নাস্তিক
  • মৃত্যু: ২৭ শে মে ১৯৬৪ সাল

জওহরলাল নেহেরুর জন্ম, পরিবার ও শৈশবকাল: 

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর জন্ম এলাহাবাদে হয়েছিল ১৮৮৯ সালের ১৪ ই নভেম্বর। তার পিতার নাম ছিল মতিলাল নেহেরু এবং মাতার নাম ছিল স্বরূপ রানী নেহেরু। জওহরলাল নেহেরুর পিতা মতিলাল নেহেরু ছিলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের একজন বিখ্যাত আইনজীবী।

ভারতের রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করার ফলে বহুবার তাকে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছিল। মতিলাল নিজে জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত হলেও তার পরিবারের পরিবেশ ছিল বিদেশানুগত।

জওহরলাল নেহেরুর শৈশব বলতে তিনি খুবই ধনী পরিবারের জন্মগ্রহণ করার কারণে বিলাসিতা এবং আদরের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন। জওহরলাল তার বাল্যকালের শিক্ষালাভ করেছিলেন ইংরেজ টিউটরের কাছ থেকে। আর সেই কারণেই তার মধ্যে বিদেশ অনুগত খুবই ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়।

জওহরলাল নেহেরুর শিক্ষা জীবন: 

তিনি ছোটবেলায় ইংরেজ টিউটরের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করার পরে ১৯০৫ সালে জওহরলাল নেহেরুকে পাঠানো হয়েছিল বিলেতে। সেখানে হ্যারো স্কুল, ট্রিনিটি কলেজ, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বশেষ লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স তে সর্বমোট ৭ বছর পর্যন্ত তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন। ভূ-তত্ত্ব, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পড়তে তিনি হঠাৎই উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দেন। পরবর্তীতে লন্ডন থেকে ১৯২২ সালে তিনি দেশে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসেন।

জওহরলাল নেহেরুর ব্যক্তিগত জীবন: 

তিনি যখন এলাহাবাদে আইন ব্যবসায় কিছুকাল জড়িত ছিলেন, সেই সময়ে দিল্লির ময়দা কল মালিকের কন্যা কমলার সঙ্গে জওহরলাল নেহেরুর বিবাহ হয় ১৯১৭ সালে, তাদের একমাত্র কন্যা ইন্দিরার জন্ম হয় ১৯২৫ সালে। এই দম্পতি একটি পুত্র সন্তানও লাভ করেন, কিন্তু দ্বিতীয় দিনেই সেই পুত্র সন্তানের মৃত্যু হয়।

জওহরলাল নেহেরুর কর্মজীবন: 

তার কর্মজীবন বলতে ১৯২২ সালে জওহরলাল নেহেরু এলাহাবাদ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, আইন ব্যবসা ছাড়াও তার পাশাপাশি তিনি পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী রাজনীতিতেও নিজের খ্যাতি অর্জন করতে থাকেন।

জওহরলাল নেহেরুর রাজনীতি জীবন যাত্রা:

বিয়ের পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯১৬ সালে তিনি রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক গুরু এবং পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় পিতা মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন, আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সব সময় গান্ধীজীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন।

ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত নীতির বিরোধিতা করার জন্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দান করার জন্য  নেহেরু কে গান্ধী জির মত অনেকবার গ্রেফতারও  হয়েছেন এবং কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। সবমিলিয়ে মোট প্রায় ১৭ বছর তিনি জেল খেলেছিলেন। জেকে বসেই তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেগুলো পরে বিখ্যাত হয়েছিল।

জওহরলাল নেহেরুর লেখা বই: 

যেহেতু তিনি রাজনীতিবিদ, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো লেখক ও ছিলেন। সেই কারণে তিনি শুধু ভারতেই নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে খুবই সুপরিচিত ছিলেন। তার লেখা বই গুলোর মধ্যে রয়েছে:- “ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া”, “গ্লিম্পসেস অফ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি” ও “অটোবায়োগ্রাফি”।

এছাড়া জানা যায় যে, তিনি জেলে বসে নানা ধরনের বিষয়ে বই লিখেছিলেন। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে অনেক চিঠি লেখেন সেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে একটা সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তার আত্মজীবনীর একটা অংশ স্কুল পাঠ্য ও হয়েছিল, যার নাম ছিল মাই চাইল্ডহুড” (My Childhood)।

জওহরলাল নেহেরুর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া:

জওহরলাল নেহেরু সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ১৯২৯ সালে ভারতীয় কংগ্রেস দল স্বাধীনতার পক্ষে সর্বাত্মক রায় দেয়। তারপর ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস দলের বিজয়ের প্রধান স্থাপক ছিলেন জওহরলাল নেহেরু।

এরপর ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। এরপর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আজীবন রাজনীতিতে গান্ধীজীর শিষ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন।

তবে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুজনের মধ্যে খুবই মতপার্থক্য দেখা দিত। গান্ধীজি ছিলেন পল্লী নির্ভর অর্থনীতির পক্ষে, কিন্তু জওহরলাল নেহেরু ছিলেন পাশ্চাত্যের মতো শিল্প উন্নত করে আধুনিক ভারত গড়ে তোলার পক্ষে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার কয়েক মাস পরে মহাত্মা গান্ধীর আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর তাদের এই মতপার্থক্য জটিল রূপ নিতে পারেনি।

জওহরলাল নেহেরুর বিশ্ব রাজনীতি:

বিশ্ব রাজনীতিতে জওহরলাল নেহেরু সবসময়ের জন্য মধ্যস্থ কারীর ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। তিনি জোট নিরপেক্ষ রাজনীতির পক্ষ অবলম্বন করেন, ১৯৬১ সালে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কর্নেল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ এবং প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর সঙ্গে একযোগে কাজ করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন করে তোলেন। বাংলাদেশে কিন্তু জোট নিরপেক্ষ দেশগুলির অন্তর্ভুক্ত।

১৪ ই নভেম্বর “শিশু দিবস” পালন করা: 

১৪ ই নভেম্বর ছিল জওহরলাল নেহেরুর জন্ম তারিখ অর্থাৎ জন্মদিন বলা যায়। তিনি শিশুদের খুবই ভালোবাসতেন আর এই জন্য তার জন্মদিন ১৪ ই নভেম্বর কে ভারতের শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। একমাত্র কন্যা সন্তান ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি ভারতের সুযোগ্য আগামী নেত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তার মৃত্যুর কয়েক বছর পর ইন্দিরা গান্ধীও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যু: 

১৯৬৪ সালের ২৭ শে মে ৭৫ বছর বয়সে ভারতের এই মহান রাজনেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক জীবনের নানা ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও জওহরলালের সাহিত্য প্রাণ হৃদয় নানা রচনায় নিয়োজিত হয়েছিল, সেটা আমরা আগেই জেনেছি।

তো চলুন জেনে নেওয়া যাক, জওহরলাল নেহেরুর লেখা কিছু গ্রন্থ, বই সম্পর্কে:

  • সোভিয়েত রাশিয়া (১৯২৮),
  • তার কন্যা ইন্দিরা লেখা Let ters from a father to his Daughter (১৯২৪),
  • Glimpses of World History (১৯৩৪),
  • China, Spain and the War (১৯৪০),
  • The Discovery India (১৯৪৬)

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তিনি অনেক দায়িত্ব ও সামনেছেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি। জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জওহরলাল নেহেরুর নাম আজও সমস্ত ভারতবাসীর মুখে মুখে শোনা যায়। ইতিহাসের পাতা থেকে সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ রূপে বিরাজ করছেন।

Leave a Comment