যতীন্দ্রনাথ দাস জীবনী 2022 – ইতিহাস, পরিবার এবং বিপ্লবী কার্যক্রম

যতীন্দ্রনাথ দাস কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? যতীন্দ্রনাথ দাস কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও যতীন্দ্রনাথ দাসের সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Jatindra Nath Das in Bengali)।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেক বিপ্লবী যারা দেশের জন্য হাসিমুখে প্রাণটাকে উৎসর্গ করে গেছেন। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন এই যতীন্দ্রনাথ দাস। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং বিপ্লবী আর তার পাশাপাশি ভগৎ সিং এর সহকর্মী।

যতীন্দ্রনাথ দাস জীবন পরিচয় - Jatindra Nath Das Biography in Bengali
যতীন্দ্রনাথ দাস জীবন পরিচয় – Jatindra Nath Das Biography in Bengali

তিনি  ২৭ শে অক্টোবর ১৯০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি ছিলেন খুবই আত্মত্যাগী, সাহসী একটি মানুষ। এই মানুষটি লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ১৯২৯ সালের ১৪ ই জুন গ্রেফতার হয়ে পড়েন। জেলে যারা বন্দী ছিলেন তাদের অধিকারের দাবিতে সেই বছরই ১৩ ই জুলাই অনশন শুরু করে দেন।

তার জন্যই তিনি সবার মনে বিশেষ ভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। একটানা ৬৩ দিন অনশন করার পর ১৩ ই সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে জেলের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীনতার পর তার সম্মানে কলকাতা মেট্রোর হাজরা অঞ্চলের মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করা হয় যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশন।

তো চলুন এই মুক্তিযোদ্ধার জীবন সম্পর্কে কিছু জানা যাক: 

  • সম্পূর্ণ নাম: যতীন্দ্রনাথ দাস
  • জন্ম: ২৭ শে অক্টোবর ১৯০৪ সাল
  • জন্ম স্থান: কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত
  • পিতার নাম: বঙ্কিম বিহারী দাস
  • মাতার নাম: সুহাসিনী দেবী
  • শিক্ষা: ১৯২০ সালে ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে কংগ্রেসের সদস্য হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। এছাড়া ১৯২৮ থেকে ১৯২৯ সনে বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি।
  • জাতীয়তা: তিনি ভারতীয়
  • পরিচিতির কারণ: ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা
  • তাঁর মৃত্যু: ১৩ ই সেপ্টেম্বর ১৯২৯, লাহোর, ব্রিটিশ ভারত

যতীন্দ্রনাথ দাসের জন্ম, শৈশব এবং শিক্ষা: 

ভারতের এই মুক্তিযোদ্ধা যতীন্দ্রনাথ দাসের জন্ম হয়েছিল কলকাতায়, তার পিতার নাম ছিল বঙ্কিম বিহারী দাস এবং মায়ের নাম ছিল সুহাসিনী দেবী।

১৯২০ সালে ভবানীপুর মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পাস করার পর কংগ্রেসের সদস্য হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। এছাড়াও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুসারে ১৯২৮ থেকে ১৯২৯ সনে বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি।

যতীন্দ্রনাথ দাসের কর্মজীবন: 

তার কর্মজীবন সম্পর্কে বলতে গেলে, ১৯২৯ সালের ১৪ই জুন যতীন দাসকে তার কলকাতার বাড়ি থেকে লাহোর পুলিশের নির্দেশে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাছাড়া ওই সময় এসেছিল যে, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত বলে এই গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে। তবে পরবর্তী সময়ে এরা জেলের ভিতর রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদা দাবি তোলেন তিনি। এই বিষয়টি বন্দিদের মর্যাদার দাবিতে এবং মানবিক সুযোগ-সুবিধার আন্দোলনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল সবার মনে।

এছাড়া এমন মুক্তিযোদ্ধা দের কর্মজীবন বলতে গেলে অসহায়দের সহযোগিতা করা এবং দেশ সেবা করাই হলো প্রধান কর্ম। তারা ১৩ ই জুলাই থেকে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের সমর্থনে অনশন সংগ্রাম আরম্ভ করে দেন যতীন্দ্রনাথ দাস অর্থাৎ যতীন দাস।

এছাড়া আর কারো অনশন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তেমন ছিল না। তাই তিনি অনুসরণ সংগ্রামে যোগ দিতে নিষেধ করেছিল অন্য সাথীদের। তার কঠোর এই অনশন সংগ্রামে তার যে মৃত্যু হবে সেটা কারোর ধারণার মধ্যে ছিল না। যতীন দাস আরও বলেন যে, তিনি নিজে অনুসরণ আরম্ভ করলে যতদিন না সরকার দাবি মেনে না নেয় ততদিন অনশন চালিয়ে যাবে।

সবাইকে বলা হয়েছিল যে, তাড়াহুড়ো করে কোন কিছু যেন না করা হয়। যতীন দাস এর এই হুঁশিয়ারি অথবা আদেশ থাকা সত্ত্বেও পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐতিহাসিক লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অনশন শুরু হয়, ওদিকে মামলার কাজও চলছিল পুরোদমে।

যতীন্দ্রনাথ দাসের বিপ্লবী জীবন: 

১৯২৩ সালে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল কলকাতার ভবানীপুরে ঘাঁটি গড়ে তুললে, তিনিও এই দলে যোগ দিয়ে দেন। পরবর্তীতে দক্ষিণেশ্বরে বিপ্লবী দলের সঙ্গে ও তার যোগাযোগ হয়। এরপর ১৯২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতার তরুণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই সময় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা জেলে তাকে পাঠানো হয়।

জেল কর্তৃপক্ষের আচরণের প্রতিবাদে ২৩ দিন পর্যন্ত অনশন করেছিলেন। এরপরে ১৯২৯ সালের ১৪ ই জুন লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী হিসেবে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে তাকে পাঠানো হয়। এখানে রাজবন্দীদের উপরে জেল কর্তৃপক্ষের যে দুর্ব্যবহার তার জন্যই তিনি শুরু করেছিলেন অনশন।

তবে এই অনশনের সময়ে তাকে বহুবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা। ৬৩ দিন টানা অনশন করার পর তিনি তার প্রাণটাকে বিসর্জন দিয়ে দেন দেশের জন্য। এইভাবে মৃত্যুবরণ করার ফলে রাজবন্দীদের উপরে অত্যাচার কিছুটা হলেও কম হয়েছিল।

এই বীর শহীদের মৃতদেহ কলকাতায় আনা হলে ২ লক্ষ এরও বেশি মানুষের মিছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এই শোকযাত্রা ক্যাওড়াতলা শ্মশানঘাট পর্যন্ত গিয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় আজও জ্বলজ্বল করছে।

তাছাড়া তিনি যখন জেলে বন্দী মানুষদের জন্য অনশন শুরু করেন তখন ব্রিটিশ সরকার জানতো যে, এমন মানুষ কখনোই সহজে হার মানবেন না, তাই সেই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছিল ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরু সহ আরো ১৭ জন বিপ্লবীকে।

প্রথমত পুলিশ অফিসারস সেন্ডার্স হত্যা, দ্বিতীয়ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, এই দুই অপরাধ সামনে এনে শুরু হল সেই লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। সমস্ত বন্দি বিপ্লবীদের নিয়ে যাওয়া হল লাহোর সেন্ট্রাল জেলে, সেই দলে ছিলেন যতীন দাসও।

যতীন্দ্রনাথ দাস এর মৃত্যু: 

আত্মত্যাগী, সাহসী মানুষটি লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ১৯২৯ সালের ১৪ ই জুন গ্রেফতার হন। জেলবন্দীদের অধিকারের দাবিতে তিনি যখন সোচ্চার হয়েছিলেন, সেই বছরই ১৩ ই জুলাই অনশন শুরু করেন, তিনি ৬৩ দিন একটানা অনশন করার পর ১৩ ই সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সেই জেলের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন।

স্বাধীনতার পর তাঁর সম্মানে কলকাতা মেট্রোর হাজরা অঞ্চলের মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করা হয় তারই নামে, যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশন

ব্রিটিশ বিরোধী এই আন্দোলনে অনশনে যে সমস্ত শহীদগণ ছিলেন: 

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অনশন করে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের কয়েকজন হচ্ছেন মহাবীর সিং, যতীন্দ্রনাথ দাস, মোহিত মোহন মৈত্র, মহেন্দ্রলাল বিশ্বাস, মোহন কিশোর নবদাস, হরেন্দ্র মুন্সি, অনিল কুমার দাস, পন্ডিত রাম রক্ষা, মনীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরো অনেক মুক্তি যোদ্ধারা।

আজ ও বর্তমানে যে কোন কাজ হাসিল করার জন্য অনশনের কথা আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। তবে কিছু দিন অনশন করার পর যখন সেই কাজটি সম্পন্ন হয়ে যায় তখন অনশন ভঙ্গ করা যায়, তবে বিপ্লবীদের মধ্যে অনেকেই এমন অনশন করে নিজেদের প্রাণটাকে উৎসর্গ করে গেছেন দেশের জন্য।

তারা একটানা বহুদিন পর্যন্ত অনশন করে নিজেদের শরীরটাকে সম্পূর্ণ রূপে শেষ করে দিয়েছেন। একেই হয়তো এক কথায় বলা যায়, শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করা। তেমনি লড়াই করেছেন একটানা ৬৩ দিন অনশন করার পর মৃত্যুবরণ করে, এই যতীন্দ্রনাথ দাস তার অমূল্য জীবনটাকে দেশের জন্য, অন্যায়ের প্রতিবাদে উৎসর্গ করে গেছেন। আর তাইতো তিনি সমগ্র দেশবাসীর মনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।

Leave a Comment