স্বাধীনতা দিবস 2022: ইতিহাস, তারিখ, এবং অজানা ঘটনা

১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়েছিল ভারত। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি জাতীয় দিবস এটি, সেই ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রতিবছর ১৫ ই আগস্ট এই দিনটিতে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয় খুবই গর্বের সাথে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আন্দোলন এবং বিভিন্ন চরমপন্থী রাজনৈতিক সমিতির আন্দোলনের পথে পরিচালিত হয়েছিল দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের এই পথ।

যার পাশাপাশি ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় এবং তার ফলে ভারত ও পাকিস্তান অধি রাজ্যের জন্ম হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা আমাদের নিশ্চয়ই অজানা নয়। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং এক কোটি ৫০ লক্ষ এরও বেশি মানুষ হয়েছেন তাদের ঘরছাড়া।

স্বাধীনতা দিবস: ইতিহাস, তারিখ, এবং অজানা ঘটনা
স্বাধীনতা দিবস: ইতিহাস, তারিখ, এবং অজানা ঘটনা

১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট জহরলাল নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ করার পর দিল্লি লাল কেল্লার লাহোরি গেটের উপর ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, তারপর সেই ভাবেই প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে দেশের হয়ে ভাষণ দেন।

ভারত একটি উৎসব প্রবন দেশ, তার পাশাপাশি এই যে ভারত স্বাধীন হওয়ার আনন্দ সেটি উৎসবের মতোই পালন করা হয়, বলতে গেলে লাল কেল্লায় উত্তলিত ভারতের জাতীয় পতাকা আজও আমাদের নজর এড়ায় না। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের সরকারি এবং বেসরকারি ভবনগুলিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার একটি প্রথা রয়েছে, যেন সেটা কোন নিয়ম নীতি।

এই দিনটি ছোট থেকে বড় সকলেই স্ফূর্তির সাথে পালন করে থাকেন। সারাদেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সমস্ত জায়গায় দেশাত্মবোধক গান এবং অনেক জায়গায় আনুষ্ঠানিকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। যেখানে দেশভক্তির সঙ্গীতে নৃত্য পরিবেশন ও করতে দেখা যায়।

রাস্তা-ঘাট, সমস্ত জায়গা সবকিছু সেজে ওঠে। জাতীয় পতাকা, ফুলের মালা, স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের ছবির সাথে সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধাঞ্জলি, সবকিছু মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবস যেন ভারতের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।

স্বাধীনতা দিবসের কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা যাক: 

  • পালনকারী: ভারত
  • ধরন: জাতীয় দিবস উদযাপন, পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত ও অন্যান্য দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান, কুচকাওয়াজ,  ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ
  • তারিখ: ১৫ ই আগস্ট
  • সংগঠন: প্রতিবছর অর্থাৎ বার্ষিক

জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কুচকাওয়াজ, বিভিন্ন রকমের দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে নিত্য পরিবেশন এই দিনটি কে সব থেকে বেশি স্মরণীয় করে রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অফিস, আদালতে মিষ্টি বিতরণ হয়ে থাকে। আর এটি হল একটি জাতীয় ছুটির দিন, সেই দিনটি সমস্ত কাজকর্ম, পঠন-পাঠন বন্ধ থাকে। আর সেই কারণে সকলেই খুবই আনন্দের সাথে এই স্বাধীনতা দিবস পালন করেন।

স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস: 

স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস বলতে গেলে অনেক গভীরে যেতে হয়। ১৭ শ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপীয় বণিকেরা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বাণিজ্য কুঠী প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮ শ শতাব্দীর মধ্যে প্রতিরোধ সামরিক শক্তির জোরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করে।

আর এটাই ছিল ভারতের জন্য সবথেকে দুঃখের বিষয়। ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পরের বছর ভারত শাসন আইন পাশ হয় এবং উক্ত এই আইন বলে যে, ব্রিটিশ রাজশক্তি কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

পরবর্তী আরো অনেক কয়েক দশকের মধ্যে ভারতের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক নাগরিক সমাজের উদ্ভব ঘটে, এই সময়কার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হলো ১৮৮৫ সালে বোম্বাইয়ের বকুল দাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা।

এক্ষেত্রে মনটেগু জেমসফোর্ড সংস্কার ছিল তা এদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই সঙ্গে রাওলাট আইনের মতো দমনমূলক আইন ও পাস করা হয় এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীরা স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন।

এরপর ১৯৩০ এর দশকে ব্রিটিশ সরকার ভারতের প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবটি আইনত করে নেয়। এই আইনের যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেই নির্বাচন গুলিতে জয়লাভ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। পরবর্তী দশক ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার দশক অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণের জন্য অসহযোগের পথে কংগ্রেসের আন্দোলন এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থানের মত ঘটনাগুলি এই দশকেই ঘটে।

এর ফলে ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হ্রাস পায় ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এবং পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে উপমহাদেশ হিসেবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কি হয়েছিল?

স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আমরা যতই বর্তমানে খুবই আনন্দের সাথে করে থাকি না কেন, এই স্বাধীনতা অনেক দুঃখের মধ্যে দিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে যুক্তরাজ্যের সরকারি অর্থভাণ্ডার ক্রমশ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

সেই সময় সদ্য নির্বাচিত লেবার সরকার অনুভব করে ক্রমাগত অস্থির হয়ে ওঠা ভারতের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বৃটেনের জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া যাবে না এবং এই ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়া অসম্ভব হবে। এছাড়া স্থানীয় সেনাবাহিনীও যে এই কাজে নির্ভরযোগ্য হবে না, তাও সরকার কিন্তু আগে থেকে বুঝতে পেরেছিল।

এমন অবস্থায় ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন ১৯৪৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অনুমোদন করতে চলেছে। তাছাড়া ভারতের নবনিযুক্ত ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই দিনটি এগিয়ে আনেন অর্থাৎ তারিখ এগিয়ে আনেন।

তার আশঙ্কা ছিল যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ক্রমাগত তর্ক বিতর্ক অন্তর্বর্তী সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির তারিখ ১৫ ই আগস্ট দিনটিকে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

তারপর দেখা যায় ১৯৪৭ সালের ৩ রা জুন ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ ভারতকে দ্বিখন্ডিত করার সিদ্ধান্ত কে অনুমোদন করে দেয়। সেই সঙ্গে সরকার ঘোষণা করে যে, নবগঠিত দুই রাষ্ট্রকে অধীন রাজ্য মর্যাদা দেওয়া হবে এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথ থেকে পৃথক হওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দুটি রাষ্ট্রের থাকবে।

এরপর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে পাস হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ (১০ অ্যান্ড ১১ জিও ৬ সি. ৩০) অনুসারে ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তান (যেটা আধুনিক এ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ড সহ) নামে দুটি রাজ্য হিসেবে বিভক্ত হয়ে যায়। আর এই আইন কার্যকর করা হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট এবং সেই সঙ্গে নবগঠিত দুই রাষ্ট্রের নিজের নিজের গণপরিষদের উপর সম্পূর্ণ আইন বিভাগীয় কর্তৃত্ব অনুমোদিত হয়।

স্বাধীনতার আগেই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন: 

কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণাপত্র অথবা ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র গৃহীত হয় ২৬ শে জানুয়ারি। সেক্ষেত্রে একটি স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই জন্য কংগ্রেস জনগণকে আইন অমান্যের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয় এবং যতদিন না পর্যন্ত ভারত সম্পূর্ন স্বাধীনতা অর্জন করছে, ততদিন পর্যন্ত সময় সময়ে কংগ্রেসের নির্দেশ পালন করতে বলে।

ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে একটি জাতীয়তাবাদী অনুভূতি জাগরিত করার জন্য এবং ব্রিটিশ সরকারকে স্বাধীনতার অনুমোদন করতে বাধ্য করার জন্য একটি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ২৬ শে জানুয়ারি এই তারিখটি কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে আসছিল। সেই সময় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সভার আয়োজন করা হতো এবং সেই সব সভায় আগত ব্যক্তিগণ স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করতেন এবং দেশের স্বাধীন হওয়ার আনন্দের সাথে স্বাধীনতা দিবস পালন করতেন।

জহরলাল নেহেরু তার আত্মজীবনীতে এই সভা গুলিকে “শান্তিপূর্ণ, ভাব গম্ভীর এবং কোনরকম ভাষণ বা উপদেশ বিবর্জিত” বলে বর্ণনা করেছেন। মহাত্মা গান্ধী সভার পাশাপাশি এই দিনটিতে আরও কিছু করার পরিকল্পনা করেন।

তিনি মনে করেন এই দিনটি পালন করা উচিত, কিছু সৃজনশীল ধরনের কাজ করা উচিত। তিনি চরকা কেটে বা অস্পৃশ্যদের সেবা করে বা হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির আয়োজন করে বা আইন অমান্য করে অথবা এই সবগুলি একসঙ্গে করে স্বাধীনতা দিবসটি খুবই সুন্দরভাবে পালন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধান বিধিবদ্ধ হয় ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। যেটা ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হতো, আজ সেটা বর্তমানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

স্বাধীনতার জন্য রক্তে রাঙ্গা ভারত ভূমি: 

১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে বৃটেনের রাজপথ শূন্য হতে থাকে, এমন পরিস্থিতিতে বৃটেনের পক্ষে অভ্যন্তরীণ অথবা আন্তর্জাতিক কোনো রকম সাহায্য লাভ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বৃটেনের লেবার সরকার বুঝতে পারে যে এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্ত্র কে সামাল দেওয়ার ক্ষমতা অথবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী হারিয়ে ফেলেছে।

এর ফলে ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে দেয় যে, ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ভারতের স্বাধীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অর্থাৎ শাসন ক্ষমতা ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য।

অনেক আন্দোলন এর মধ্য দিয়ে কত বিপ্লবীদের প্রাণ অকালে ঝরে গেছে, দেশকে স্বাধীন করার জন্য তারা তাদের আত্ম বলিদান দিয়ে আজও অমর হয়ে রয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার সময় যত এগিয়ে আসতে থাকে পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ততোই বৃদ্ধি পায়।

দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে ব্রিটিশ বাহিনীর অক্ষমতার কথা মাথায় রেখে ভারতের ভাইসরয় লুইস মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনটি সাত মাস এগিয়ে আনেন অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের জুন মাসে আবুল কালাম আজাদ, জহরলাল নেহেরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ভিমরাও রামজি আম্বেদকর প্রমুখ ও জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের প্রস্তাব মেনে নেন। হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের অঞ্চল গুলি ভারতে ও মুসলমান সংখ্যাগুলো অঞ্চল গুলির নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়, পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

লক্ষ লক্ষ মানুষ, লক্ষ লক্ষ মুসলমান শিখ ও হিন্দু শরণার্থী রেডক্লিফ লাইন পেরিয়ে নিরাপদ দেশে আশ্রয় নেন। পাঞ্জাবের শিখ অঞ্চল গুলি দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার জন্য রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে দাঙ্গার প্রকোপ কিছুটা কমতে শুরু করে।

তা সত্ত্বেও ২ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষ সীমান্তের দুই পাড়ে দাঙ্গায় নিহত ও আহত হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট নতুন পাকিস্তান অধীর রাজ্য তৈরি হয়। করাচিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহু এই রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ নেন।

মাঝরাতে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট জহরলাল নেহেরু তার বিখ্যাত নিয়তির সঙ্গে অভিসার প্রদানের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ভারতীয় ইউনিয়নের জন্ম হয়, নতুন দিল্লিতে নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রূপে কার্যবহন করেন, মাউন্টব্যাটেন হন স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল।

ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন: 

কত বীর, বীরাঙ্গনা এই স্বাধীনতা দিবসের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের এই নিঃস্বার্থ দান আমরা কখনোই ভুলতে পারবো না। ১৫ ই আগস্ট আমরা সকলেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। এই দিনটি অন্যান্য উৎসবের মতোই খুবই উত্তেজনা, আনন্দ ও গর্বের সাথে পালন করে থাকি।

দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, অনুষ্ঠানটি জাতীয় চ্যানেল দূরদর্শনের সাহায্যে সারা দেশের সম্প্রচারিত হয়। রাজ্য, রাজধানী গুলিতেও পতাকা উত্তোলন সহ সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে।

বিভিন্ন রকমের বেসরকারি সংস্থা ও পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কর্ম ক্ষেত্রেও এই পতাকা উত্তোলন হয়ে থাকে। তার পাশাপাশি আরো অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই উপলক্ষে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাজ পোশাক পরে শোভাযাত্রা করে।

দেশের জন্য লড়তে থাকা বীর সৈনিক এবং বীর শহীদদের ফটোতে ফুলের মালা দেওয়া হয়। তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্যালুট জানানোর পাশাপাশি দেশের জাতীয় পতাকাকে স্যালুট জানানো হয়। এই দিন অনেকেরই গেরুয়া সাদা সবুজ রঙের পোশাক পরতে দেখা যায়। যেটা এই দিনটাকে আরও বেশি উজ্জ্বল করে তোলে। গেরুয়া আবির, সবুজ আবির দিয়ে রঙ্গলি করতেও দেখা গিয়েছে অনেক জায়গায়।

বিশেষ করে স্বাধীনতা দিবসের সকালের দিকটা এমন ভাবে পালন করা হয়, যে সময় কিভাবে কেটে গেছে বোঝাই যায় না। স্বাধীনতা দিবসে দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দে এবং দিনটি খুবই ভালো করে উদযাপন করার পাশাপাশি মিষ্টি এবং আরও অন্যান্য খাবার পরিবেশন ও বিতরণ করা হয়।

বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের যুগ, তাই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আর দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজকাল সকলেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, whatsapp এই সমস্ত জায়গাতে এই দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে থাকেন।

আবার অনেকেই আগাম শুভেচ্ছা জানাতেও ভোলেন না। ছোট ছোট জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো রাস্তাঘাট, বাচ্চাদের হাতের ছোট ছোট জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতা দিবসের ছবি, সবকিছু সত্যিই গায়ে শিহরণ জাগিয়ে তোলে।

সারাদিন ধরে চলতে থাকে দেশাত্মবোধক গান, পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এবং যুবক যুবতীরা এই স্বাধীনতা দিবসটি উদযাপন করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ভালোবাসা।

Leave a Comment