বিপিনচন্দ্র পাল জীবনী 2022 – ইতিহাস, পরিবার এবং বিপ্লবী কার্যক্রম

বিপিনচন্দ্র পাল কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? বিপিনচন্দ্র পাল কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও বিপিনচন্দ্র পাল সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Bipin Chandra Pal in Bengali)।

বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং লেখক। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপিনচন্দ্র পাল অনল বর্ষী বক্তৃতা দিতেন। বিপিনচন্দ্র পাল এর আহবানে হাজার হাজার যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিপিনচন্দ্র পাল জীবন পরিচয় - Bipin Chandra Pal Biography in Bengali
বিপিনচন্দ্র পাল জীবন পরিচয় – Bipin Chandra Pal Biography in Bengali

এই স্বাধীনতা সংগ্রামী অন্যদিকে তিনি ছিলেন সাংবাদিক এবং লেখক। তার জীবনী সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না, তো চলুন এই স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন ব্যক্তিত্বের সম্পর্কে জানা যাক:

দেশ নায়ক বিপিনচন্দ্র পালের জীবনী: 

  • সম্পূর্ণ নাম: বিপিন চন্দ্র পাল
  • জন্ম: ৭ ই নভেম্বর ১৮৫৮ সাল
  • জন্মস্থান: পইল গ্রাম, হবিগঞ্জ জেলা, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে বাংলাদেশ)
  • পিতার নাম: রামচন্দ্র পাল
  • প্রতিষ্ঠান: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন,
  • মৃত্যু: ২০ মে ১৯৩২ সাল

বিপিনচন্দ্র পালের জন্ম: 

বিপিনচন্দ্র পাল এর জন্ম ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৭ ই নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলাতে হয়েছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাতাবরণের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তিনি লেখাপড়ার দিক থেকে খুবই আগ্রহী ছিলেন।

বিপিনচন্দ্র পালের শৈশবকাল: 

শৈশব কালে প্রতিটি শিশুদের জীবন থাকে চিন্তামুক্ত। বিপিনচন্দ্র পাল ছোট থেকেই খুবই ভালো ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। ছোটবেলায় মৌলবীর কাছে পড়াশোনা করেছেন, পরবর্তীতে ভর্তি হয়েছিলেন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় এ। এ ক্ষেত্রে বলতে গেলে তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী। এছাড়া খেলাধুলার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিলই না।

সব সময় ঘরের ভিতরে নিজেকে বন্দী করে রাখতেন এবং বইয়ের পাতার মধ্যে ডুবে থাকতেন। একবার যা পড়তেন সারা জীবন তা  মনে রাখার চেষ্টা করতেন। ভালবাসতেন বিভিন্ন সাহিত্যিক দের লেখা পড়তে, বিশেষ করে বিপিনচন্দ্র পাল ইংরেজি সাহিত্য জগতে প্রবেশ করার জন্য খুবই আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বিপিনচন্দ্র পালের শিক্ষা জীবন: 

শিক্ষা জীবন বলতে গেলে, প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। স্কলারশিপ লাভ করলেন। এবারে তিনি শহর কলকাতায় ভর্তি হলেন বিশ্ব বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে।

সেখানে দুই বছর পড়াশোনা করেছিলেন, চার্চ মিশনারি সোসাইটিতেও এক বছর পড়াশোনা করেন। গণিতে অসম্ভব ভয় থাকার জন্য আই এ পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি।

বিপিনচন্দ্র পালের কলকাতার আসা:

তিনি যখন কলকাতাতে আসেন, তখন তিনি জড়িয়ে পড়লেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে। তখন এখানে  সংস্কারপন্থী ব্রাহ্ম আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠছিল।

ব্রাহ্ম ধর্মীয় নেতারা হিন্দু পৈত্তলিক কথাবাদ কে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন রকমের কুসংস্কারকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

বিপিনচন্দ্র পালের কর্মজীবন: 

তার কর্মজীবন সম্পর্কে বলতে গেলে, ১৮৭৭ সালের শিবনাথ শাস্তির কাছে ব্রহ্ম ধর্মে তিনি দীক্ষা নিলেন। তবে এর জন্য তাকে শাস্তিও ভোগ করতে হয়েছিল। তার পিতা তাকে ত্যাজ্য পুত্র করে দিয়েছিলেন। ২১ বছর বয়সে বিপিনচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হল।

তিনি এলেন কটকে। একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কাজ গ্রহণ করলেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতের পার্থক্য দেখা দিল, স্বাধীনচেতা বিপিনচন্দ্র চাকরি ছেড়ে দিলেন। কলকাতা, ব্যাঙ্গালোর, বিভিন্ন বিদ্যালয় শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি।

আবার এর মধ্যেই তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতি ক্ষেত্রে। জাতীয় মহা সমিতির তৃতীয় অধিবেশন ডাকা হল মাদ্রাজ শহরে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে, বিপিনচন্দ্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থেকে অস্ত্র আইন প্রত্যাহারের দাবি সমর্থন করে বক্তৃতা দিলেন।

বিপিনচন্দ্র পালের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং লাল-বাল-পাল: 

বিপিনচন্দ্র সশস্ত্রবাদী আন্দোলনের পথে তার আনুগত্য এবং ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন। তখন দেশে জাতীয় আন্দোলন নতুন পথে এগিয়ে চলেছে। বিপিনচন্দ্র বৈপ্লবিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। বাংলাদেশ এবং মহারাষ্ট্রের স্থাপিত হলো একাধিক গুপ্ত সমিতি। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদের দেশ জুড়ে বিপ্লবের সৃষ্টি হল।

এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি, ভাষণ দিতেন জ্বালাময়ী ভাষায়। সর্বোচ্চ দেখা যেত যুদ্ধের উন্মাদনা, শুরু হয় জনসভা মিছিল এবং বিলাতি কাপড়ে আগুন লাগানোর উৎসব। এই সমস্ত বিষয়ে যোগ দিয়েছিলেন পাঞ্জাবের লালা লাজপত রায় এবং মহারাষ্ট্রের বালগঙ্গাধর তিলক। তাদের তিনজনকে একসঙ্গে সেই কারণে বলা হতো লাল – বাল – পাল।

বিপিনচন্দ্র পালের ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদনা: 

১৮৯৮ সালে বৃত্তি পেয়ে যে এক বছর অক্সফোর্ডে থেকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, ১৯০১ সালে ভারতে ফিরে এসে নিউ ইন্ডিয়া নামে একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদনা করতে থাকেন।

বিপিনচন্দ্র পাল “বন্দেমাতেরম পত্রিকার” সম্পাদক: 

এই যে লাল বাল পাল পরিচালিত চরমপন্থী দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন শ্রী অরবিন্দ। বিপিনচন্দ্র চরমপন্থীদের মুখপত্র বন্দে মাতেরম পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হলেন। পুলিশ তার উপর কড়া নজর রেখেছিল। কিন্তু মুরারি পুকুর বাগানে বোমার কারখানা আবিষ্কৃত হওয়ার পর গ্রেফতার হলেন অরবিন্দ। তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহীতার মামলা দায়ের করা হলো।

বিপিনচন্দ্র সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র সবকিছু শুনে গেলেন, কোন কথার উত্তর দিলেন না। সেই কারনে আদালত এর অবমাননার দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করতে হলো তাঁকেও। তারপর তিনি যোগ দিলেন তমলুক গঠনের আন্দোলনে। গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের বিরোধিতা করলেন, এরপর বিপিনচন্দ্র সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন।

বিপিনচন্দ্র পালের ইংরেজি বই: 

বিপিনচন্দ্র পাল কিছু ইংরেজি বইও লিখেছেন, যেমন ধরুন

  • ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম (Indian Nationalism),
  • স্বরাজ এন্ড দি প্রেজেন্ট  সিচুয়েশন (Swaraj and the Present Situation),
  • ন্যাশনালিটি এন্ড এম্পায়ার (Nationality and Empire),
  • দি বেসিস অফ সোশাল রিফর্ম (The Basis of Social Reform),
  • দি সোল অফ ইন্ডিয়া (The Soul of India)

এছাড়া বেশ কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন যেমন ধরুন যে, হিন্দু রিভিউ, পরিদর্শক, দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দি ডেমোক্র্যাট।

বিপিনচন্দ্র পালের গ্রন্থ গুলি: 

বিপিনচন্দ্রের প্রতিভা ছিল সর্বতোমুখী। ধর্ম অথবা ইতিহাস, সমাজ, বিজ্ঞান, সাহিত্য সর্বত্রই ছিল তার প্রতিভার ছাপ। ১৯১২ সাল থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত লেখাই ছিল তার প্রধান কাজ।

তার লিখিত গ্রন্থ গুলির মধ্যে আছে, ভারত সীমান্তে রুশ, শোভোনা, মহারানী ভিক্টোরিয়ার জীবনী, নবযুগের বাংলা, চরিত্র চিত্র, সত্তর বৎসর, রাষ্ট্রনীতি, সাহিত্য ও সাধনা, মারকিনে চার মাস।

বিপিনচন্দ্র পালের মৃত্যু: 

১৯৩২ সালের ২০ শে মে বিপিনচন্দ্র পাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। বিপিনচন্দ্র পাল কে আমরা শুধুমাত্র বিপ্লবী হিসেবেই জানবো না, বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন খুবই মহান সংঘটক। বিপিন চন্দ্র পালের ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে জনচেতনা জাগিয়ে তোলা।

তাৎক্ষণিক আবেগ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লবে অংশগ্রহণ করা যায়, কিন্তু সেই বিপ্লব স্বাভাবিক স্ফুরণ নয়। তাই বিপিনচন্দ্র পাল কে আমরা একজন বিপ্লবী এবং দক্ষ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম সেনা বলতে গেলে বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন। তিনি একজন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, কখনো দেখা গিয়েছে তিনি খুবই মেধাবী, সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রেও তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বেশ কিছুদিন শুধুমাত্র সৃজনশীল লেখাতে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চরমপন্থী ত্রয়ী অর্থাৎ লাল বাল পালের অন্যতম বিপিনচন্দ্র ভারতীয় রাজনীতিতে আধুনিক চিন্তাধারা এবং যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি সূচনা করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে তার মেধা পূর্ণ চিন্তাধারা সত্যিই অনেকখানি প্রভাবিত করেছিল তরুণ সমাজকে।

Leave a Comment