অগ্নিবীর ভগৎ সিং জীবনী 2022 – ইতিহাস, পরিবার এবং বিপ্লবী কার্যক্রম

ভগৎ সিং কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? ভগৎ সিং কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও ভগৎ সিং এর সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Bhagat Singh in Bengali)।

স্বাধীনতা আন্দোলনে ভগৎ সিং কে চেনেন না এমন ভারতীয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভগৎ সিং ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী একজন বিপ্লবী। তিনি কিনা স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভগৎ সিং এর জন্ম হয় একটি জাট শিখ পরিবারে।

অগ্নিবীর ভগৎ সিং জীবন পরিচয় - Bhagat Singh Biography in Bengali
অগ্নিবীর ভগৎ সিং জীবন পরিচয় – Bhagat Singh Biography in Bengali

এছাড়া তিনি খুবই সাহসী ছিলেন, কিশোর বয়সে এই ভগৎ সিং ইউরোপীয় বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা করেন এবং নৈরাজ্যবাদ ও কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

ভগৎ সিং, তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের শহীদ বিপ্লবী দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী। ভগৎ সিং ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী বিপ্লবী, ভগৎ সিং ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে শ্রদ্ধা করতেন।

তো চলুন এই অগ্নিবীর ভগৎ সিং এর জীবনী সম্পর্কে জানা যাক: 

অগ্নিবীর ভগৎ সিং এর জীবনী:

  • সম্পূর্ণ নাম: ভগৎ সিংহ অথবা ভগৎ সিং
  • জন্ম তারিখ: ২৮ শে সেপ্টেম্বর ১৯০৭
  • জন্মস্থান: লয়ালপুর, পাঞ্জাব, ব্রিটিশ ভারত
  • পিতার নাম: সর্দার কিষান সিংহ সান্ধু
  • মায়ের নাম: বিদ্যাবতি দেবী
  • আন্দোলন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, নওজওয়ান ভারত সভা, কীর্তি কিষান পার্টি
  • প্রধান সংগঠন: হিন্দুস্তান সোসালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন
  • ধর্ম: শিখ ধর্ম
  • মৃত্যু: ২৩ শে মার্চ ১৯৩১
  • মৃত্যুর স্থান: লাহোর, পাঞ্জাব, ব্রিটিশ ভারত

ভগৎ সিং এর পরিবার:

ভগৎ সিং এর জন্ম হয়েছিল পাঞ্জাবের লয়ালপুর জেলার নিকটস্থ খাতকর কালান গ্রামের একটি সান্ধু জাট  শিখ পরিবারে। ভগৎ সিং এর পিতার নাম ছিল সরদার কিষান সিংহ সান্ধু এবং মায়ের নাম ছিল বিদ্যাবতি দেবী। তিনি খুবই ছোটবেলা থেকেই দেশ এর স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার শৈশব কেটেছে অন্যান্য শিশুদের তুলনায় অনেকটাই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার: 

যেহেতু বিপ্লবী ভগৎ সিং খুবই ছোটবেলা থেকেই এই সমস্ত বিষয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেহেতু ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করার পর ভারতীয় রাজনীতিতে দলাদলি ও সম্প্রদায়িক বিরোধ খুবই তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এই অস্থিরতা অনেকটা কমে আসে।

সেই সঙ্গে চারিদিকে দাবি উঠেছে প্রশাসনিক ও সাংবিধানের সংস্কারে জন্য। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় দিকে দিকে জেগে উঠল নব জীবনের সাড়া। “স্বাধীনতা ভারতবাসীর জন্মগত অধিকার আর আমরা স্বাধীনতা চাই” এটাই ছিল মূল বক্তব্য।

সাইমন কমিশন (Simon Commission):

ভারতের রাজনীতিতে এমন একটি অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়, আর সেই অস্থিরতা লক্ষ্য করে বড়লাট লর্ড আরউইন একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন করার কথা ঘোষণা করেন, আর সেই কমিশনের নাম দেওয়া হয় সাইমন কমিশন।

নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রখ্যাত উদারনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট সাংবিধানিক আইন বিশারদ স্যার জন সাইমন। আর সেই কারণেই কিন্তু তার নাম অনুসারে এই কমিশনের নাম দেওয়া হয়েছে সাইমন কমিশন

সাইমন কমিশনের সদস্য বৃন্দ: 

এই কমিশনের সদস্যরা ছিলেন ভাই কাউন্ট বার্নহ্যাম, স্টিফেন ওয়েলিস, লর্ড স্ট্রাথ কোনা, এডওয়ার্ড ক্যারোগান, কর্নেল লেনফক্স এবং মেজর এটলি। তবে কোনো ভারতীয়কে কিন্তু এই কমিশনে নেওয়া হয়নি। এই কমিশনের আসল উদ্দেশ্য ছিল, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সংস্কার আইন ভারতে কতটা কার্যকর করা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে রিপোর্ট দায়ের করা।

কমিশনে কোন ভারতীয় সদস্য পদ গ্রহণ না করায় ভারতে এই কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মুসলিম লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল গুলো কমিশনের গঠনতন্ত্রের নিন্দা করে। যেখানে কমিশন যাচ্ছে, সেখানেই হচ্ছে হরতাল, লক্ষ লক্ষ কন্ঠে শোনা যাচ্ছে “গো ব্যাক সাইমন”।

গো ব্যাক সাইমন স্লোগান: 

সাইমন কমিশনের নিন্দা জানাতে গো ব্যাক সাইমন স্লোগানটি খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এই কমিশনের ক্ষেত্রে কলকাতা, বোম্বে, মাদ্রাজ সব জায়গাতে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ৩০ শে অক্টোবর কমিশন এলো লাহোরে।

কালো পতাকা হাতে কমিশনকে ধিক্কার জানাতে পথে বেরোলো খুবই বড় মিছিল। মিছিলের অগ্রভাগে পাঞ্জাবের অবিসংবাদি নেতা লালা লাজপত রায় ছিলেন। তিনিও কিন্তু বলেছিলেন যে গো ব্যাক সাইমন, কিন্তু পুলিশবাহিনী হিংস্র সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল মিছিলের উপরে।

এলো পাথারি চলল লাঠিচার্জ, যার ফলে আহত হলেন বহু মানুষ। পুলিশের লাঠির নির্মম সেই আঘাতে প্রবীণ নেতা লালা জীর সর্বাঙ্গ রক্তে লাল হয়ে গেল। তবুও কিন্তু তিনি বলে চলেছেন “গো ব্যাক সাইমন, সাইমন ফিরে যাও”।

যেহেতু তিনি খুবই বয়স্ক ছিলেন তাই এমন আঘাতে জর্জরিত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন সেই যে জ্ঞান হারিয়েছেন আর সেই জ্ঞান তার কখনোই ফিরে আসেনি।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কয়েকদিন ধরে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে তিনি শহীদ হয়েছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নির্ভীক যোদ্ধা লালা লাজপত রায়। এই খবর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা যায়।

দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো এই দুঃসংবাদ, সমস্ত ভারতবাসী স্তব্ধ এবং দুঃখিত হয়ে পড়ল। কিন্তু অন্যায় তারা মুখ বুঝে কখনোই মেনে নিতে রাজি ছিল না। পাঞ্জাবির বীর বিপ্লবী ভগৎ সিং, শুখদেব, রাজগুরু, চন্দ্রশেখর আজাদ, শপথ নিলেন যে “লাইফ ফর লাইফ” এ ছাড়া আর কোন হিসাব আমরা মানবো না।

এর এক মাস পরে ১৭ ই ডিসেম্বর সেদিন বিকেল চারটে ৩৭ মিনিটের সময় দেখা গেল পুলিশ দপ্তরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, রাজগুরু প্রমুখ বিপ্লবীরা। তারা আগে থেকে খবর নিয়ে জেনেছেন যে মিস্টার স্কটের অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় কিন্তু এটাই।

সেই জন্য তারা রিভলভার নিয়ে তৈরি হয়েই এসেছেন, কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল মিস্টার স্কট মোটরসাইকেল নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। পলকের মধ্যেই রাজ গুরুর হাতে সেই রিভলবার থেকে গুলি করা হয়, তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবার ভগৎ সিং এর হাতে থেকে গুলি চলল।

গুলির শব্দ লক্ষ্য করে ছুটে এল একজন ইউরোপিয়ান সার্জেন্ট তার সাথে মিস্টার স্কট এর দেহরক্ষী চন্দন সিং, এরপরে চন্দ্রশেখর আজাদ ও গুলি করেছিলেন, তার গুলিতে মুখ থুবড়ে পড়ল চন্দন সিং। হৈচৈ এর মধ্যে কোথায় পালিয়ে গেল এই তিন বিপ্লবী তার কোন হদিস পাওয়া গেল না।

কিন্তু এমন কাজে ভুল হয়েই থাকে, বিপ্লবীদের দুর্ভাগ্য ছিল যে, সেদিন খুবই বড় ভুল হয়েছিল তাদের, গুলিতে যে নিহত হয়েছিল সেটা ছিল একজন পুলিশ অফিসার। মিস্টার স্কট নন। এরপর আর কি, যা হবার তাই। তদন্ত আর নির্বিচারে গ্রেফতার, সরকার হত্যাকারীর সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠলো। এই হত্যাকাণ্ডের চার দিন পরে ২৯ এ ডিসেম্বর শহরের সর্বত্রই একটি ইপ্তিহার বিলি করা হয়েছে।

তাতে বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “এতদ্বারা মহামান্য সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে অবগত করা হচ্ছে যে তাদের মধ্যে কেউ স্যান্ডার্স এর হত্যাকারীকে অর্থাৎ মিস্টার স্কট এর হত্যাকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে হিন্দুস্তান সোসালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি এর সামরিক অধিকর্তার তরফ থেকে তাকে প্রচুর অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে।”

এরপর ভগৎ সিং চলে এলেন কলকাতায়, কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। বিপ্লবীদের এই কলকাতা জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তারা আত্মগোপন করার জন্য এই জায়গাটাই বেছে নিয়েছিলেন। বাংলার বিপ্লবীরা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন তাদের দিকে।

সামান্য কিছু অস্ত্রশস্ত্র আর কতগুলি বোমা নিয়ে ভগৎ সিং ফিরে গেলেন লাহোরে। এবার তার সংকল্প ছিল আরো শক্ত, তিনি এবারে এমনভাবে আঘাত হানবেন যাতে সাগরের ওপারে শাসকের আসন যেন টলে ওঠে। গোটা সাম্রাজ্য তোলপাড় হয়ে যায়। বিপ্লবীদের একটাই বীজ মন্ত্র হল “কর্তব্য সাধন, কিংবা শরীর পতন”।

আমরা সকলেই জানি যে, স্বাধীনতা কখনোই হাসতে হাসতে আসে না। স্বাধীনতা আনতে গেলে অনেক রক্ত ঝরাতে হয়। তার জন্য উপযুক্ত মূল্য দিতে হয়েছে অনেক অমূল্য জীবনকে। বিপ্লবীদের হতে হয় নির্ভয় আর সবথেকে যেটি প্রিয় সেই জিনিসটিকে বন্ধক রেখে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। আর সেই কারণে হাসতে হাসতে অনেক বিপ্লবী প্রাণ উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। তার মধ্যে ভগৎ সিং এর নাম খুবই উল্লেখযোগ্য।

বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করা শুরু: 

এরপর থেকে শুরু হয় বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করা। একে একে গ্রেফতার হয়ে পড়েন শুখদেব, রাজগুরু, যতীন দাস, প্রমূখ বিপ্লবীরা। যতীন দাস কে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কলকাতাতে, তারপর তাকে গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লাহোরে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরবর্তীকালে যতীন দাস দীর্ঘ ৬৩ দিনের অনশন করার পর যখন তিনি দেহ ত্যাগ করেন, এই বিষয়টি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ ১০ ই জুলাই শুরু হল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। প্রধান আসামি হিসেবে ভগৎ সিং সুখদেব বটুকেশ্বর দত্ত, রাজগুরু, যতীন দাস প্রমুখো বিপ্লবীবৃন্দ ছিলেন। এমন বিপ্লবীদের ছাড়াও আরো অনেকে ছিলেন, মোট ২৪ জন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং স্যানডার্স হত্যা।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ ধ্বনি: 

এই ঘটনার পরেই আর কিছু বক্তব্য আছে কিনা আদালত তা জানতে চাইলে ভগৎ সিং খুবই উঁচু কণ্ঠে বলেছিলেন ইনক্লাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অভিযুক্ত বন্দীরা গলা মেলান এই স্লোগান এর সাথে। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার প্রথম শুনানি আরম্ভ হয়েছিল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৭ ই অক্টোবর, দীর্ঘ ১৫ মাস পরে মামলার রায় বের হয়। রায়ের বিরুদ্ধে ভগৎ সিং এর পিতা সরদার কিসান প্রিভি কাউন্সিল আপিল করার জন্য আদালতে একটি আবেদন পেশ করলেন।

তার পিতাকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন যে “আমার পক্ষ সমর্থনের জন্য আপনি স্পেশাল ট্রাইবুনালের বিচারপতিদের নিকট আবেদন করিয়াছেন, এই সংবাদ অবগত হইয়া আমি মর্মাহত হইয়াছি। এই কঠিন আঘাত স্থির ভাবে সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার এই আবেদন ভিক্ষা আমার মানসিক শান্তিকে সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করিয়াছে।”

ভগৎ সিং পিতাকে উদ্দেশ্য করে এটা বলতে চেয়েছেন যে, “আমার জীবনকে যতখানি মূল্যবান মনে করেন, আমি তা কখনোই মনে করি না। আমার আদর্শকে বলি দিয়ে আমার প্রাণকে রক্ষা করার কোন প্রয়োজন নেই। আমার বহু সহকর্মীর অবস্থা আজ ঠিক আমারই মতো গুরুতর।

আমরা সকলে একই আদর্শ গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং এতকাল একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়াইয়া আসিয়াছি। শেষ পর্যন্ত আমরা ঠিক সেই ভাবেই থাকিব। এই ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি যত গুরুত্বই হোক না কেন, তাতে কোন ক্ষতি নাই।”

ভগৎ সিং এর ফাঁসির আদেশ: 

যেহেতু তিনি গ্রেফতার হয়েছেন, বিচার হিসেবে ফাঁসি হওয়াটাই তখন ব্রিটিশদের মূল শাস্তি ছিল। জাতীয় বীর ভগৎ সিং এর ফাঁসির আদেশ শুনে ভারতবাসী খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। চারিদিকে আওয়াজ উঠল ভগৎ সিং এর ফাঁসি হলে আমরা তার সহ্য করব না। এই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে গান্ধী ও বড়লাট লর্ড আরউইনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, এই চুক্তিকে দিল্লি চুক্তি ও বলা হয়।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ৫ মার্চ গান্ধী আরউইন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকার নিপীড়নমূলক আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রত্যাহার করে নেন, হিংসাত্মক কার্যকলাপের অভিযোগে রাজনৈতিক বন্দিদের ছাড়া অন্যান্য সব বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে, সমুদ্র তীরে বসবাসকারী অধিবাসীদের নিজেদের প্রয়োজনে লবণ তৈরি করা এবং বিলিতি মদ ও বস্ত্রের দোকানে শান্তিপূর্ণভাবে পিকেটিং করা বিধি সম্মত হবে, এসব সরকার স্বীকার করে নেন এবং ভারতের প্রতিরক্ষা বৈদেশিক সম্পর্ক সংখ্যালঘু শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা সব দায় দায়িত্ব সরকারের হাতে রাখা হবে।

এই শর্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হলো, কেবলমাত্র মুক্তি পেলেন না বিপ্লবীরা। ৫ ই মার্চ তারিখে চুক্তি স্বাক্ষর করে এই গান্ধীজীর সিমলা থেকে একটি বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, এই চুক্তি সর্বত্রভাবে গৃহীত বলে সহিংস কাজের জন্য যাদের ফাঁসির হুকুম হয়ে আছে, তারাও মুক্তি পাবেন বলে তিনি আশা করেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এটাই যে, দেশবাসী প্রচন্ড রেগে থাকলেও ২৩ শে মার্চ তারা জানতে পারলেন দেশবাসীর সকল আবেদন অগ্রাহ্য করে ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরু কে সেদিন লাহোর জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা, লক্ষ লক্ষ মানুষ  ভারতবর্ষে সেদিন করাচির পথে হেটে ছিলেন।

যেহেতু অনেক বন্দী মুক্তিপ্রাপ্ত হয়েছিল তেমনি ভগৎ সিং এর একজন সহকর্মী মুক্তিপ্রাপ্ত অজয় ঘোষ বলেছিলেন, “বাইরে এসে সেদিন বুঝতে পারলাম ভগৎ সিং এর মূল্য আমাদের দেশের জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। তখনকার দিনে যত সভা হত সেখানে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান হতো ভগৎ সিং জিন্দাবাদ। কিন্তু আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই।”

ভগৎ সিং এর সেই ঐতিহ্যপূর্ণ গোঁফ তার সাথে মাথার যে হ্যাট সেই ছবি প্রতিটি যুবকের বুকে আঁকা ছিল। “আমার বুক আনন্দ গর্ভে ভরে যেত যখন ভাবতাম এমন একজন লোককে সহকর্মী ছিলাম আমি যাকে আমি চিনতাম,” এমনই বলেছিলেন ভগৎ সিং এর সহকর্মীরা।

ভগৎ সিং এর ফাঁসি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মার্চ মাসের করাচি অধিবেশনের ঠিক একদিন আগে তাদের ফাঁসি হয়ে যায়। ভগৎ সিং এর বয়স তখন ২৪ ও পূর্ণ হয়নি। বলতে গেলে সবে মাত্র তারুণ্যে পা দিয়েছেন তিনি। একটা ধুমকেতুর মতো ভগৎ সিং ভারতবর্ষের রাজনৈতিক আকাশে কিছুক্ষণের জন্য উদয় হয়েছিল কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই তা আবার ডুবেও যায়। তার উপর দেশের জন্য অকালেই তিনি প্রাণটা বিসর্জন দিয়েছেন।

তিনি এতটাই নির্ভীক ছিলেন যে, তিনি সবসময় বলতেন “যখন বেঁচে থাকবে, সেই সময় শুধু নিজের মেজাজে বাঁচো, একমাত্র মরণের পরে অন্যের সাহায্য নিও।”তাই তিনি নিজের মেজাজে বেঁচেছেন এবং মরতেও ভয় পাননি।

ফাঁসির মঞ্চে তিনিও কিন্তু ক্ষুদিরামের মতো হাসতে হাসতে জীবনের জয়গান গিয়ে ভারতবর্ষের ইনকিলাব জিন্দাবাদ এই মহামন্ত্রের উচ্চারণ করে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছেন। বিপ্লবী ভগৎ সিং এর ভারতবর্ষের জন্য এই যে আত্মত্যাগ তা সমস্ত ভারতবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Comment