বাদল গুপ্ত জীবনী 2022 – ইতিহাস, পরিবার এবং বিপ্লবী কার্যক্রম

বাদল গুপ্ত কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? বাদল গুপ্ত কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও বাদল গুপ্তের সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Badal Gupta in Bengali)।

স্বাধীনতা আন্দোলনে বিনয় বাদল দীনেশ এর নাম অবশ্যই শুনে থাকবেন। বাদল গুপ্ত ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের শহীদ বাঙালি বিপ্লবী

বাদল গুপ্ত জীবন পরিচয় - Badal Gupta Biography in Bengali
বাদল গুপ্ত জীবন পরিচয় – Badal Gupta Biography in Bengali

বাদল গুপ্তের আসল নাম ছিল সুধীর গুপ্ত, ১৯১২ সালে ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলের পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

যখন তিনি স্কুলে পড়াশোনা করছিলেন তখন থেকেই শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের মাধ্যমে দেশ প্রেম জেগে ওঠে তার মধ্যে। তার সাথে সাথে সেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সে।

বীর যোদ্ধা বাদল গুপ্তের জীবনী সম্পর্কে জানা যাক:

  • সম্পূর্ণ নাম: সুধীর গুপ্ত (বাদল গুপ্ত)
  • জন্ম: ১৯১২ সালে
  •  জন্মস্থান: পূর্ব শিমুলিয়া, বিক্রমপুর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে যেটি বাংলাদেশ)
  • জাতীয়তা: তিনি ভারতীয়
  • পরিচিতির কারণ: রাইডার্স বিল্ডিং এ হামলা
  • মৃত্যুর কারণ: আত্মহত্যা (পটাশিয়াম সায়ানাইড সেবন করার ফলে)
  • মৃত্যু: ৮ ই ডিসেম্বর ১৯৩০ সাল, যখন বয়স ছিল ১৭ থেকে ১৮ (কলকাতা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ব্রিটিশ ভারত, বর্তমানে ভারত)

বাদল গুপ্তের শৈশবকাল: 

আমরা আগেই জেনেছি যে, বাদল গুপ্তের আসল নাম ছিল সুধীর গুপ্ত। তার জন্ম হয়েছিল ঢাকার বিক্রমপুর এলাকার পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে, যা কিনা বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত।

বানারীপাড়া স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন। বাদল গুপ্ত বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করেছিলেন।

বাদল গুপ্তের পড়াশোনা: 

বাদল গুপ্ত খুবই ছোট বয়সে স্বাধীনতা বিপ্লবে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন। তারপর প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ হলে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল বানারীপাড়া স্কুলে।

ছোটবেলা থেকেই বাদল গুপ্ত ছিলেন খুবই সাহসী এবং দুরন্ত স্বভাবের। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি তার বেশ মনোযোগ ছিল বলে জানা যায়।

রাইটার্স ভবনে হামলা: 

বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর বিপ্লবীরা কারা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল কার্নেল এন এস সিমপসনের উপরে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারাগারে রাজবন্দীদের উপরে অকথ্য অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। আরো লক্ষ্য ছিল যে কলকাতার ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয় রাইটার্স বিল্ডিং অর্থাৎ রাইটার্স ভবনে হামলা চালিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের মনে ভয়, ভীতি সৃষ্টি করা।

১৯৩০ সালের ৮ ই ডিসেম্বর দিনেশ গুপ্ত এবং বিনয় বসুর সাথে বাদল গুপ্ত মিলিত হয়েছিলেন। তারা ইউরোপীয় বেশভূষার ছদ্মবেশ নিয়ে রাইটার বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন এবং কর্নেল সিমপসন কে লক্ষ্য করে গুলি করে হত্যা করেন।

ব্রিটিশ পুলিশ পাল্টা গুলি চালাতে শুরু করে এবং বন্দুক যুদ্ধে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার আহত হয়েছিলেন, কাছাকাছি লালবাজার থেকে কমিশনের টেগার্ডের নেতৃত্বে পুলিশবাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে এবং তিন বিপ্লবী পরাজয় স্বীকার করে নেন। তবে তারা পুলিশের হাতে ধরা দিতে চাননি।

সেই কারণে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে বাদল গুপ্ত আত্মহত্যা করেছিলেন সেই জায়গাতে এবং বিনয় ও দীনেশ আত্মহত্যার জন্য নিজেদের উপরে গুলি চালান। বিষ খেয়ে ঘটনাস্থলেই বাদল গুপ্তের মৃত্যু হয়। আর ইতিহাসে এই তিন জনের মহাকরণ আক্রমণ অলিন্দ যুদ্ধ নামে খ্যাত।

রাইটার্স বিল্ডিং এর এই হামলাতে বিনয়, বাদল ও দীনেশ এর উপর গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই দলের বিনয় ও দীনেশের চেয়ে বাদল ছিলেন সব থেকে ছোট। বাদল গুপ্ত ছিলেন সেই সময়ে দলের সবথেকে ছোট সদস্য, যিনি কিনা সবেমাত্র ১৮ তে পা দিয়েছেন। আগামী ডিসেম্বর ছেলেবেলার শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং চত্বর ঘুরে ঘুরে দেখতে চান বাদল গুপ্ত।

এরপর সেই রাইটার্স বিল্ডিং ঘুরে দেখার পর শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনকে বাদল গুপ্ত অনুরোধ করেছিলেন, একবার যদি কাকামনি তরীনাথ গুপ্তের বাড়ি দেখা করা যায়, দলের কঠোর নিয়ম বিপ্লবীদের বাড়ির সাথে সমস্ত সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু শিক্ষক নিকুঞ্জের কি মনে হয়েছিল তিনি এইসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে বাদলকে নিয়ে গিয়েছিলেন কাকামনির কাছে।

পথে ছোট বোন মৃদুলার জন্য বাদল কিনেছিলেন চিনেমাটির একটি পুতুল। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার বিপ্লবী, নগেন্দ্রনাথ জড়িয়ে ছিলেন তখনকার দিনের বিখ্যাত আলিপুর বোমা মামলায়। ১৩৪ নম্বর হ্যারিসন রোডে দুই ভাইয়ের হোমিওপ্যাথির চেম্বার থেকে বোমা উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরু হয় ভলেন্টিয়ারদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দীনেশ গুপ্ত ভলেন্টিয়ারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেন। একটি পর্যায়ে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এই ভলেন্টিয়ার্স বিপ্লবীরা কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

১৯২৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে দীনেশ গুপ্তের প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস, বার্জ এবং পেডি কে হত্যা করেন। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তারা ছিল কুখ্যাত অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। বাংলার বিপ্লবীরা একের পর এক তাদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করার প্রতিশোধ নিয়ে ছিলেন।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়, বাদল, দীনেশের নাম অনুসারে কলকাতার ডালহৌস এর স্কয়ারের নাম পাল্টে রাখা হয়েছিল বি-বা-দী-বাগ, অর্থাৎ বিনয়- বাদল- দীনেশ-বাগ। এই অলিন্দ যুদ্ধের স্মৃতিতে রাইটার্স বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলে একটি প্রস্তর ফলক ও আছে।

বাদল গুপ্তের মৃত্যু: 

রাইটার্স বিল্ডিং এ আক্রমণ করার পর ৮ ই ডিসেম্বর ১৯৩০ সালে পুলিশদের হাতে ধরা পড়ে যান তিন বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশ। তারা পুলিশের হাতে ধরা দিতে চাননি বলেই আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু আত্মহত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেদের বন্দুকের গুলিতে আহত হয়েছিলেন বিনয় ও দীনেশ, কিন্তু বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে সেই জায়গাতেই সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করেন।

সবে মাত্র ১৮ তে পাওয়া দেওয়া এই কিশোর অদম্য সাহসিকতার সাথে পুলিশের হাতে নিজেকে তুলে না দিয়ে আত্মহত্যা করার পথটাই বেছে নিয়েছিলেন।

এত ছোট বয়সে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করা, অদম্য সাহসিকতা দেখানো, খুবই কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। ইতিহাসের পাতায় এই বীরদের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের কৃতিত্ব সত্যিই ভোলার নয়।

Leave a Comment