সরস্বতী পূজার পাশাপাশি আর কোন কোন পূজা হয়? জানেন কি?

সরস্বতী পূজা বাঙালি দের জীবনে এক বিশেষ উৎসব। বাঙালির Valentine বলা যেতে পারে।প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে বসন্ত পঞ্চমী পালিত হয়। যা সরস্বতী পূজা নামে সকলেই জানেন। এই তিথিতে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়।

শাস্ত্র মতে এই তিথিতেই সরস্বতী প্রকট হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তাইতো বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও সংগীতের দেবী সরস্বতীকে আরাধনা করার জন্য মূর্তি গড়িয়ে এই বিশেষ শুভদিনে পূজা অর্চনা করা হয়।

সরস্বতী পূজার পাশাপাশি আর কোন কোন পূজা হয়? জানেন কি?
সরস্বতী পূজার পাশাপাশি আর কোন কোন পূজা হয়? জানেন কি?

অনেক প্রাচীনকাল আগে থেকে এটা জেনে আসছে সবাই যে, সরস্বতী পূজা করলে জ্ঞান ও বিদ্যা লাভ করা যায়। তাই এই তিথিতে সরস্বতীর পুজো করার বিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য রয়েছে।

তাছাড়া এই শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যার দেবীর আরাধনার পাশাপাশি আরো অনেক পূজা জড়িত রয়েছে। সেগুলি সম্পর্কে হয়তো অনেকেই জানেন না। যে নিয়ম গুলি, আরও অন্যান্য পূজা গুলি এই শুভদিনের শুভ সময়কে আরো বেশি সুন্দর করে তোলে।

সরস্বতী পুজার শুভক্ষণ:

২৫ শে জানুয়ারি দুপুর ১২ টা ৩৪ মিনিটে পঞ্চমী তিথির সূচনা হবে, তবে ২৬ শে জানুয়ারি সকাল ১০ টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত পঞ্চমী তিথির সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু উদয়া তিথি অনুযায়ী ২৬ শে জানুয়ারি বসন্ত পঞ্চমী ও সরস্বতী পূজা করা হবে।

কখন সরস্বতী পূজা করবেন:

শুভ তিথিতে সেই পূজা সম্পন্ন হলে তার ফলাফল খুবই শুভ হয়। তাই সরস্বতী পূজার দিন যদি মধ্যাহ্ন পেরিয়ে পঞ্চমী তিথি শুরু হয়, তাহলে পরের দিন বসন্ত পঞ্চমী পূজো পালিত হবে।

তবে এই পূজা হবে পরের দিন। যখন প্রথম দিনের মধ্যভাগের আগে তিথি শুরু হয় না। এই কারণে কখনো কখনো ক্যালেন্ডার অনুসারে বসন্ত পঞ্চমী চতুর্থী তিথিতেও পড়ে যায়।

প্রাচীন কাল থেকে এটি জ্ঞান ও শিল্পের দেবী সরস্বতীর জন্মদিন হিসেবে বিবেচিত হয়, কেননা এই শুভ দিনেই যে তিনি প্রকট হয়েছিলেন। প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতী-সদৃশ্য দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়।

মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের এই শুভ দিনে অর্থাৎ বসন্ত পঞ্চমীতে কামদেব ও রতীর পূজা:

কামদেব ও রতীর পুজো করলে দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। সমস্ত বাধা বিপদ দূর হয়ে যায় এমনটা ধারণা হয়ে আসছে অনেক প্রাচীনকাল আগে থেকে।

বসন্ত পঞ্চমীর দিনে সরস্বতী পুজোর পাশাপাশি কামদেব ও রতীর পূজাও করা উচিত, এর ফলে জীবনের সমস্ত বাধা বিপদ দূর হয়ে গিয়ে সংসারে আসবে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং দাম্পত্য জীবন হবে আরো সুখময়।

সরস্বতী পুজা করার নিয়ম:

প্রতিটি পূজা কোন না কোন নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে পালন করতে হয়। তেমনি এই সরস্বতী পূজার বিশেষ কিছু নিয়ম ও রীতি রয়েছে। যেগুলি অবশ্যই অবশ্যই মেনে চলতে হয়, তবেই সেই পূজা সুসম্পন্ন হয়। সরস্বতী পূজার দিন যেগুলি আপনাকে পালন করতে হবে সেগুলি নিচে দেওয়া হল:

#১) এই শুভ দিনে সকালে স্নান করে সাদা অথবা হলুদ পোশাক পরতে হয়। তারপর সরস্বতী পূজার সংকল্প করুন।

#২) তারপর সরস্বতীর মূর্তি অথবা ছবি স্থাপন করতে হয়, গঙ্গা জল দিয়ে স্নান করানোর পরে হলুদ পোশাক অর্পণ করতে হবে। এই পূজায় গণেশ এর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কেননা সর্বপ্রথম গণেশের পূজা করা হয়।

#৩) এরপর হলুদ ফুল, পলাশ ফুল, সাদা চন্দন, অক্ষত, হলুদ রঙের রোলি, গন্ধ আতর ও হলুদ আবির এগুলি দেবীর চরণে অর্পণ করতে হবে।

গাঁদা ফুলের মালা এই পূজার বিশেষ অঙ্গ। তাই দেবীকে গাঁদা ফুলের মালা নিবেদন করতে একেবারেই ভুলবেন না কিন্তু। এর পাশাপাশি পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রদীপ ও ধূপকাঠি।

#৪) দেবী কে হলুদ রঙের মিষ্টি ভোগ নিবেদন করা উচিত, কেননা দেবী হলুদ রং খুবই পছন্দ করেন। বেসনের লাড্ডু, বরফি, সাদা বরফি, ক্ষীর ও মালপোয়া নিবেদন করতে হয়।

#৫) সরস্বতী পূজায় সরস্বতী বন্দনা ও মন্ত্র উচ্চারণ ছাড়া সরস্বতী পূজা একেবারেই অসম্পূর্ণ, তাই সরস্বতী বন্দনা করে আরাধনা করলে বিদ্যার্থীরা মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারেন। এরপর সরস্বতী বন্দনা ও মন্ত্র জপ করে সরস্বতীর পূজা সম্পন্ন করতে হবে। সরস্বতী পূজায় সরস্বতী কবচ জপ করা খুবই শুভ বলে মনে করা হয়।

#৬) শেষে “ওম সরস্বতৈ নমঃ স্বাহা” মন্ত্র জপ করে যজ্ঞ করুন। ১০৮ বার এই মন্ত্র জপ করে আহুতি দেবেন। তারপর সবশেষে সরস্বতীর আরতী করুন।

সরস্বতী পূজার দিন যে বিষয় গুলো আপনাকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখতে হবে:

#১) সরস্বতী পূজার দিন হলুদ বস্ত্র পরিধান করা খুবই শুভ বলে মনে করা হয়, তাই এই দিন সকল পড়ুয়াদের এবং আরো অন্যান্য ব্যক্তিদের হলুদ বা বাসন্তী রংয়ের পোশাক পরতে দেখা যায়।

#২) সরস্বতী পূজার দিন পড়ুয়ারা বই, কলম, পেন্সিল এবং পড়াশোনায় যে সমস্ত সরঞ্জাম রয়েছে তা দেবীর চরণে অর্পণ করতে পারেন অথবা পুজো করতে পারেন।

#৩) সরস্বতী পূজার দিন যে কোন বাদ্যযন্ত্র যদি ঘরে থাকে তাহলে সেগুলোর পূজা দিতেও একেবারেই ভুলবেন না।

#৪) যারা শিল্প ও সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত তাদের এই দিনেই দেবী সরস্বতীর আরাধনা করাটা খুবই প্রয়োজন।

#৫) এই দিন উপোস করে থাকতে হয়, তারপর নিরামিষ ভোজন করতে হয়।

বসন্ত পঞ্চমী ও সরস্বতী পূজার মাহাত্ম্য:

প্রতিটি পূজা এক একটি বিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বহন করে। তেমনি বসন্ত পঞ্চমীও সকলের জীবনে এক বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ প্রভাব ফেলে। বসন্ত পঞ্চমীকে শ্রী পঞ্চমী, মধুমাসজ্ঞান পঞ্চমীও বলা হয়ে থাকে। তাছাড়া এটি সরস্বতী পূজার দিন হিসেবে সকলের কাছে বেশি পরিচিত। কথিত আছে যে এই দিন বসন্ত ঋতুর সূচনা হয়।

এই দিন বিদ্যা ও জ্ঞান এর দেবীর পূজা করা হয়। যা করলে জ্ঞান ও প্রখর বুদ্ধির অধিকারী হতে পারেন। আবার এই তিথিতে অবুঝ মুহূর্ত থাকে। তাই যে কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা যেতে পারে এই শুভ তিথি মেনে।

সবদিক থেকে দেখা যায় যে, এই সরস্বতী পূজা সকলের জীবনে এক শুভ সময়ের সূচনা ঘটাবে। সরস্বতী পূজার পাশাপাশি আরো অন্যান্য শুভ নিয়ম কানুন, পূজা পার্বণ সবকিছু ব্যক্তির জীবনে সুন্দর প্রভাব ফেলবে।

যার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে সকলেই কিছুটা হলেও ধারণা করতে পেরেছেন নিশ্চয়ই। শুভ তিথি উপলক্ষে সকলের সরস্বতী পূজা, বসন্ত পঞ্চমী কাটুক খুবই সুন্দরভাবে।

Leave a Comment