বাংলা : About Rabindranath Tagore's Childhood, Boyhood, Youngage, Family all Saying by Rabindranath Tagore


কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের বাল্যকাল ও নিজের জীবনের কিছু অংস নিজের মুখে বলছেন ...

‘আমরা তিনটি বালক একসঙ্গে মানুষ হইতে ছিলাম। আমার সঙ্গীদুটি আমার চেয়ে দুই বছরের বড়ো। তাঁহারা যখন গুরুমশায়ের কাছে পড়া আরম্ভ করিলেন আমারও শিক্ষা সেইসময়ে শুরু হইল, কিন্তু সে কথা আমার মনেও নাই। কেবল মনে পড়ে, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’। তখন ‘কর’ ‘খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটাইয়া সবেমাত্র কূল পাইয়াছি। সেদিন পড়িতেছি ‘ জল পড়ে পাতা নড়ে’। আমার জীবন এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা।...’

‘বাড়ির বাইরে আমাদের যাওয়া বারণ ছিল, এমনকী,বাড়ির ভিতরেও আমরা সর্বত্র যেমন-খুশি জাওয়া-আসা করিতে পারিতাম না। সেইজন্য বিস্ব-প্রকৃতিকে আড়াল-আবডাল হইতে দেখিতাম।...’ 
... আমার জন্মের কয়েক বৎসর পূর্ব হইতেই আমার পিতা প্রায় দেশভ্রমণেই নিযুক্ত ছিলেন। বাল্যকালে তিনি আমার কাছে অপরিচিত ছিলন বলিলেই হয়। মাঝে মাঝে তিনি কখনো হঠাৎ বাড়ি আসিতেন। একবার পিতা আসিলেন আমাদের তিনজনের উপনয়ন দিবার জন্য। বেদান্তবাগীশকে লইয়া তিনি বৈদিক মন্ত্র উপনয়নের অনুষ্ঠান নিজে সংকলন করিয়া লইলেন...

...একদিন তেতলার ঘরে ডাক পড়িল।  পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন আমি তাঁহার সঙ্গে হিমালয় যাইতে চাই কিনা। ‘চাই’ এই কথাটা যদি চিৎকার করিয়া আকাশ ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম, তবে মনের ভাবের উপযুক্ত উত্তর হইত। কোথায় বেঙ্গল একাডেমি আর কোথায় হিমালয়!... আমার বয়সে এই প্রথম আমার জন্য পোশাক তৈরি হইয়াছে। কী রঙের, কী রূপ কাপড় হইবে তাহা পিতা স্বয়ং আদেশ করিয়া দিয়েছিলেন। মাথার জন্য একটা জরির-কাজ করা গোল মখমলের টুপি হইয়াছিল। সেটা আমার হাতে ছিল, কারণ নেড়া মথার উপর টুপি পরিতে মনে মনে আপত্তি ছিল। গাড়িতে উঠিয়াই পিতা বললেন, ‘মাথায় পরো’।... যাত্রা আরম্ভে প্রথমে কিছুদিন বোলপুরে থাকিবার কথা...। গাড়ি ছুটিয়া চলিল; তরুশ্রেনীর সবুজ-নীল-পাড় দেওয়া  বিস্তীর্ণ মাঠ এবং ছায়াচ্ছন্ন গ্রামগুলি রেলগাড়ির দুইধারে দুই ছবিরঝর্ণার মতো বেগে ছুটিতে লাগিল, যেন মরীচিকার বন্যা বহিয়া চলিয়াছে। সন্ধার সময়ে বোলপুরে পৌঁছালাম।...

...পথের মধ্যে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল যেটা এখনও আমার মনে স্পষ্ট আঁকা রহিয়াছে। টিকিট পরীক্ষক আসিয়া আমার টিকিট দেখিল।... তখন আমার বয়স এগারো। বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। স্টেশন মাস্টার কহিল, ‘ইহার জন্য পুরা ভাঁড়া দিতে হইবে।’ আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বাক্স হইতে তখনই নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহারা ফিরাইয়া দিতে আসিল তিনি সে টাকা লইয়া ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। তাহা প্ল্যাটফর্মের পাথরের মেঝের উপর ছড়াইয়া পড়িয়া ছনছন করিয়া বাজিয়া উঠিল। স্টেশন মাস্টার অত্যন্ত সংকুচিত হইয়া চলে গেল; টাকা বাঁচাইবার জন্য পিতা যে মিথ্যা কথা বলিবেন এ সন্দেহের ক্ষুদ্রতা তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল।... 

...তাঁহার রুচি ও মতের বিরুদ্ধে অনেক কাজ করিয়াছি; তিনি ইচ্ছা করিলেই শাসন করিয়া তাহা নিবারণ করিতে পারিতেন, কিন্তু কখনো তাহা করেন নাই। যাহা কর্তব্য তাহা আমরা অন্তরের সঙ্গে করিব, এজন্য তিনি অপেক্ষা করিতেন। সত্যকে এবং শোভনকে আমরা বাহিরের দিক হইতে লইব, ইহাতে তাঁহার মন তৃপ্তি পাইত না; তিনি জানিতেন, সত্যকে ভালবাসতে না পারিলে সত্যকে গ্রহণ করাই হয় না। যেমন করিয়া তিনি পাহাড়ে-পর্বতে আমাকে একলা বেড়াইতে দিয়েছেন, সত্যের পথেও তেমনি করিয়া চিরদিন তিনি আপন গম্যস্থান নির্ণয় করিবার স্বাধীনতা দিয়াছেন। ভুল করিব বলিয়া তিনি ভয় পান নাই, কষ্ট পাইব বলিয়া তিনি উদ্বিগ্ন হন নাই। তিনি আমাদের সম্মুখে জীবনের আদর্শ ধরিয়াছিলেন কিন্তু শাসনের দণ্ড উদ্যত করেন নাই।... 

...ফিরিবার সময়ে রেলের পথেই আমার ভাগ্যে আদর শুরু হইল।...বাড়িতে যখন আসিলাম অন্তঃপুরের বাধা ঘুচিয়া গেল, চাকরদের ঘরে আর আমাকে কুলাইল না। মায়ের ঘরের সভায় খুব একটা বড়ো আসন দখল করিলাম। তখন আমাদের বাড়ির যিনি কনিষ্ঠ বধু(নতুন বৌঠান – কাদম্বরী দেবী) তাঁহার কাছ হইতে পচুর স্নেহ ও আদর পাইলাম।... পাহাড় হইতে ফিরিয়া আসার পর ছাদের উপরে মাতার বায়ুসেবন সভায় আমিই প্রধানবক্তার পদ লাভ করিয়াছিলাম। ...পৃথিবীসুদ্ধ লোকে কৃত্তিবাসের বাংলা রামায়ণ পড়িয়া জীবন কাটায় আর আমি পিতার কাছে স্বয়ং বাল্মীকির স্বরচিত অনুষ্টুপ ছন্দের রামায়ণ পড়িয়া আসিয়াছি, এই খবরটাতে মাকে সকলের চেয়ে বেশি বিচলিত করিতে পারিয়াছিলাম। তিনি অত্যন্ত খুশি হইয়া বলিলেন, ‘আচ্ছা বাছা, সেই রামায়ণ আমাদের একটু পড়িয়া শোনা দেখি।’ ... আমার পড়া অতি অল্পই, তাহাও পড়িতে গিয়া দেখি মাঝে মাঝে অনেকখানি অংশ বিস্মৃতিবশত অস্পষ্ট হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু, যে-মা পুত্রের বিদ্যা-বুদ্ধির অসামান্যতা অনুভব করিয়া আনন্দসম্ভোগ করিবার জন্য উৎসুক হইয়া বসিয়াছেন তাহাঁকে ‘ভুলিয়া গেছি’ বলিবার মতো শক্তি আমার ছিল না... 

...ছেলেবালায় আমার একটা মস্ত সুযোগ এই ছিল যে, বাড়িতে দিনরাত সাহিত্যের হাওয়া বহিত।...সাহিত্যের শিক্ষায়, ভাবের চর্চায়, বাল্যকাল হইতে জ্যোতিদাদা আমার প্রধান সহায় ছিলেন। তিনি নিজে উৎসাহী এবং অন্যকে উৎসাহ দিতে তাঁহার আনন্দ। আমি অবাধে তাঁহার সঙ্গে ভাবের ও জ্ঞানের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতাম; তিনি বালক বলিয়া আমাকে অবজ্ঞা করিতেন না। ... এক সময়ে পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতিদাদা নতুন নতুন সুর তৈরি করায় মাতিয়াছিলেন। প্রত্যহই তাঁহার অঙ্গুলিনৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সুরবর্ষণ হইতে থাকিত। আমি এবং অক্ষয়বাবু তাঁহার সেই সদ্যজাত সুগুলিকে কথা দিয়া বাঁধিয়া রাখিবার চেষ্ঠায়  নিযুক্ত ছিলাম। গান বাঁধিবার শিক্ষানবিসি এই রূপে আমার আরম্ভ হইয়াছিল। আমাদের পরিবারে শিশুকাল হইতে গান চর্চার মধ্যেই আমরা বাড়িয়া উঠিয়াছি। আমার পক্ষে তাহার একটি সুবিধা এই হইয়াছিল, আতি সহজেই গান আমার সমস্ত প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ কইয়াছিল। তাহার অসুবিধাও ছিল। চেষ্টা করিয়া গান আয়ত্ত্ব করিবার উপযুক্ত অভ্যাস না হওয়াতে শিক্ষা পাকা হয় নাই। সংগীত বিদ্যা বলিতে যাহা বোঝায় তাহার মধ্যে কোনো অধিকার লাভ করিতে পারি নাই।...

...আমার পনেরো-ষোলো হইতে আরম্ভ করিয়া বাইশ-তেইশ বছর পর্যন্ত এই যে একটা সময় গিয়াছে ইহা অত্যন্ত অব্যবস্থার কাল ছিল।...অপরিণত মনের প্রদষালোকে আবেগগুলা সেইরূপ পরিমাণ বহির্ভূত অদ্ভুত-মূর্তি ধারণ করিয়া একটা নামহীন পথহীন অন্তহীন অরণ্যের ছায়ায় ঘুরিয়া বেড়াইত ।...
...মেজদাদা প্রস্তাব করিলেন, আমাকে তিনি বিলাত লইয়া যাইবেন। পিতৃদেব যখন সম্মতি দিলেন তখন আমার ভাগ্য-বিধাতার এই আর-একটি অযাচিত বদান্যতায় আমি বিস্মিত হইয়া উঠিলাম। বিলাতযাত্রার পূর্বে মেজদাদা আমাকে প্রথমে আমেদাবাদে লইয়া গেলেন। তিনি সেখানে জজ ছিলেন। আমার বউঠাকুরণ এবং ছেলেরা তখন ইংল্যান্ডে, সুতরাং বাড়ি এক প্রকার জনশূন্য ছিল। 
...ইংরাজিতে নিতান্তই কাঁচা ছিলাম বলিয়া সমস্ত দিন ডিকশনারি লইয়া নানা ইংরাজি বই পড়িতে আরম্ভ করিয়া দিলাম। বাল্যকাল হইতে আমার একটা অভ্যাস ছিল, সম্পূর্ণ বুঝিতে না পারিলেও তাহাতে আমার পড়ার বাধা ঘটিত না।... আমেদাবাদে ও বম্বাইয়ে মাস ছয়েক কাটাইয়া আমরা বিলাতে যাত্রা করিলাম। 

...আমার বিলাত যাইবার আগে হইতে আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে বিদ্বজ্জনসমাগম নামে সাহিত্যিকদের সম্মিলন হইত। সেই সম্মিলনে গীতবাদ্য কবিতা-আবৃত্তি ও আহারের আয়োজন থাকিত। আমি বিলাত হইতে ফিরিয়া আসার পর একবার এই সম্মিলনী আহূত হইয়াছিল, ইহাই শেষবার। এই সম্মিলনী উপলক্ষই ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ রচিত হয়। আমি বাল্মীকি সাজিয়াছিলাম ও আমার ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা স্বরস্বতী সাজীয়াছিল; ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ নামে মধ্যে সেই ইতিহাসটুকু রহিয়া গিয়াছে।...

...ইহার পরে কিছুদিনের জন্য আমারা সদর স্ট্রীটের দল কারোয়ারে সমুদ্রতীরে আশ্রম লয়িয়াছিলাম। কারোয়ার বোম্বাই প্রেসিডেন্সির দক্ষিণ অংশে স্থিত কর্ণাটের প্রধান নগর। তাহা এলালতা ও চন্দনতরুর জন্মভূমি মলয়াচলের দেশ। মেজদাদা তখন সেখানে জজ ছিলেন। কারোয়ার হইতে ফিরিয়া আসার কিছুকাল পরে ১২৯০ সালে ২৪ অগ্রহায়ণে ১৮৮৩ আমা বিবাহ হয়। তখন আমার বয়স বাইশ বৎসর।...’ 

...আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পইচয়...। জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্ত হাসিকান্নায় একেবারে নিরেত করিয়া বোনা। এমন সময় কোথা হইতে এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহুরতের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাঁই লাগিয়া গেল। চারিদিকে মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল, এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমেষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভূত আত্মখন্ডন... মৃত্যু যখন মনের চারিদিকে হঠাৎ একটা ‘নাই’-অন্ধকারের বেড়া গাড়িয়া দিল, তখন সমস্ত মনপ্রাণ অহোরাত্র দুঃসাধ্য চেষ্টায় তাহারই ভিতর দিয়া কেবলই ‘আছে’-আলকের মধ্যে বাহির হইতে চাহিল। কিন্তু, সেই অন্ধকারের অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে।...